বৃহস্পতিবার, ১৬ Jul ২০২০, ০৬:১৪ পূর্বাহ্ন

আখতার জামানের পদাবলি

আখতার জামানের পদাবলি

আমরা

গৌতম জানে না, গাছেরও প্রাণ আছে
জানে না বলেই
প্লাটফর্মে শুয়ে থাকা শিশুটির মতো
রেলের পাশে–
বেড়ে ওঠে অবাঞ্ছিত গাছ।

তারা সুখ-দুঃখের একাউন্টিং বুঝে না
প্রতিটি শিমুল-ফোটা-ভোরই ধুয়ে ফেলে আঁধারের বিষাদ।

আমরা গাছের হাসি দেখি না
কান্না দেখি না, রক্তও না–
ধর্মগ্রন্থ মুখস্তবিদ্যায় পারঙ্গম।

গাছলিপি

রাজনীতিজ্ঞের আশ্বাসবাণী শুনে কাজ নেই
বরং পাঠ করো
জানালার কাচে জমে থাকা শিশিরকাব্য
লিখে রাখো
ঘাসফুল কান্নার নোট।

দূর থেকে দেখলে
নদীতীরের কাশফুলকে ঘনই মনে হয়।
আপাতদৃষ্টিতে তাদের সৎ মনে হলে
প্রতিটি পতিতাও কুমারী হবে

বাদ দাও।
বরং দেখে নাও–
জন্মজঠরে কতোটা ভ্রুণ নষ্ট করে গাছ পিতা হয়।

লিখে রাখো গাছলিপি।

পাখির কোনো লিঙ্গান্তর নেই

আরশীনগর জানে লৌহশব্দপাঠ। কবরভর্তি কোলাহল নিয়ে ট্রেন ছুটে স্বর্গের অভিমুখ। যেতে যেতে ভেঙে দেয় পাখির সঙ্গমপরবর্তীঘুম।

অতঃপর…

জেগে থাকে শিমুলরাত কুয়াশামাখা ভোরে। পাখিদের নৈশভোজ লাগে না, প্রেম হলেই হয়। এখানে প্রেমের সাক্ষী রাত, পাখির প্রেমিক পাখি। মানুষের ক্ষুধা কচুপাতাজল, মানবীর প্রেমিক মানব। পাখির কোনো লিঙ্গান্তর নেই।

দুষ্ট বিশ্বায়ন

নদী, সেতো আজন্ম নারী
যার প্রতিটি ঢেউয়ের ভাঁজে জমা থাকে
রাশিরাশি ভালোবাসা, কিলোকিলো অভিমান, আর জানালা ভেদ করা আকাশসম দৃষ্টিসুখ।
কিন্তু হায়!
এদেশে নদীও বায়ুর মতো
বিশ্বায়ন দুষ্টে দূষিত।

গাছ, সেতো আমৃত্যু পিতা
যার প্রতিটি পাতার ভাঁজে লেখা থাকে স্নেহলিপি,
বেঁচে থাকার আশ্বাস, ডারউইনের সবুজ বিবর্তনবাদ।
কিন্তু হায়!
আমরা বৃক্ষপিতার সন্তান খেয়ে বাঁচি
বিশ্বায়ন-ষড়যন্ত্রে
তার বুকেই চালাই ছুরি-কাঁচি।

প্রেমের কোনো রাষ্ট্রধর্ম নেই

তারা দিনরাত
প্রেমের পোস্টমর্টেম করায় ব্যস্ত
ডোম-ডাক্তার জানে না–
প্রেম কোনো রাষ্ট্রধর্ম মানে না
আর মানে না বলেই–
প্রেমিক মাত্রই বিদ্রোহী।

অবাধ্য না হলে
জাতীয় পতাকা আঁকা যায় না
সে ধর্ম তো শিখিয়ে গেছেন
জাতির পিতা ও তাঁর অনুসারীগণ।

চিরকালীন বাউলস্বভাবী নদী
কারো শাসন মানে না
অনবরত লেখে প্রেমের ইতিহাস
ঢেউয়ের মননে থাকে শিল্পের বাসিন্দা
কারা করে
হুদাই প্রেমের সমালোচনা?
প্রেম নিজেই নিজের সমালোচক।

তিল

তোমার ঠোঁটে ঐ তিলটি যদি না থাকতো
রমণের সময়– আমি কি ভুলেও তাকাতাম তোমার দিকে!
কলঙ্কচিহ্নটি আছে বলেই না চাঁদ মাতালসুন্দরী
কখনো ভাবি
কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ– তুমি, না তোমার তিল?
চিমটি দিয়ে যদি তুলে নিই ক্ষুদ্র শস্যের মতো কালো চিহ্ন
তুমি ছাড়া কোনো অর্থ বহন করে নাতো!
মাঝেমাঝে ভাবি
কে বেশি সুন্দরী– তোমার তিল, না তুমি?
ভাবনার জানালা খুলে
যে কথা জানলাম– দুইয়ের সংযোগই প্রেম, বিচ্ছিন্নতায় অনাসৃষ্টি।

অমৈথুনঅমৃত

তিনশো’ফিট রাস্তার ধারে
থানকুনির মতো গজিয়ে ওঠে টি-স্টল।

ক্লান্তি সংক্ষেপ করতে
সূর্যও যোগ দেয় চা-বিরতি পর্বে।
দুধ-চিনি ও চা-পাতার সাথে
এক্সট্রা হিসেবে পাওয়া যায় অমৈথুনঅমৃত।

শাঁই করে চলে যায় গাড়ি
মৃতভোজী-পাখির মতো শিস বাজিয়ে।

চিরুনি থেকে ঝরেপড়া খুসকির মতো
চায়ের কাপে উড়ে আসে হেমলক’ধুলো
সূর্যের সাথে আগত পাখিসব
এক্সট্রা চিনি ভেবে খেয়ে নেয় সেইসব।

অদেখা

পিতার আঙুল ধরে শুরু করেছিলাম হাঁটা
এখনও হাঁটছি
উত্তর থেকে দক্ষিণমেরু
শৈশব থেকে মাঝ বয়স।

পথের ধুলো জানে
কচ্ছপপায়ে হেঁটে চলার আনন্দ।
কতোটা মাঠ পেরুলে নান্দনিক একটা ফোস্কা পড়ে
সে হিশেব রাখেনি দিনপঞ্জিকা

শুধু হেঁটেছি
নদীর তীর ধরে
দেখেছি মাছেদের ঢেউঢেউ কান্না।

দিগন্তরেখা পেরুতে চেয়েছি
যে রেখা চলে গেছে অরণ্য হয়ে
পৃথিবীসীমান্ত বরাবর।

দেখা হয়েছে অনেকের সাথে
কথাও
অদেখা রয়ে গেলো
বীজ ফেটে বের হওয়া শিশুর কান্নাদৃশ্য।

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com