মঙ্গলবার, ০৭ Jul ২০২০, ০২:১২ অপরাহ্ন

একগুচ্ছ কবিতা: সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

একগুচ্ছ কবিতা: সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

অবরুদ্ধ প্রকৃতির প্রতিশোধ

কতদিন পাখিরা উড়েনি এ তল্লাটে দলবেঁধে
নিরাপদ জলের বুদবুদ তুলে নেচে উঠেনি ডলফিন
হরিণের পাল পালিয়েছে নৃশংস বন্দুকের ভয়ে
কত বিলুপ্ত প্রাণের অভিশাপে ভারী পৃথিবীর প্রান্তর
অথচ এই আলো বাতাস মাটি জলে
তাদেরও ছিল সমান অধিকার।

কলেরা, প্লেগ, বসন্তের দিনগুলোতে
কত মারী মহামারীর কান্না
মৃত্যুর মিছিল এসেছে যুগে যুগে
সৎকারহীন লাশের দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী
কত নদী গেছে মরে, শুকিয়েছে সাগরের জল।
স্রষ্টার অভিসম্পাতে ধ্বংস হতে হতেও
বেঁচে গেছে যে জাতি
তারাও পুনরায় সব ভুলে কানায় কানায়
ভরেছে পাপের ঝুলি।

ইয়েমেনের ক্ষুধার্ত শিশুর মুখ দেখে
কাঁপেনি বিশ্বমোড়লের বুক
সিরিয়া, কাশ্মীর, প্যালেস্টাইন, ইরাকের অবরুদ্ধ মানুষের অশ্রুতে গলেনি বিবেক
বারুদের গন্ধে মাতাল শাসকের উল্লাস দেখে
কাঁপেনি কী স্রষ্টার আরশ!

এই করোনার কালে অবরুদ্ধ সকলে
কী প্যালেস্টাইন-কাশ্মীর কী বিশ্বমোড়ল
এক কাতারে কাঁদে একই অনুভবে দেখে
অবরুদ্ধ প্রকৃতির ক্রোধ
স্রষ্টার মধুর প্রতিশোধ!

চলে যাওয়াটাই সত্য

যদি চলে যেতে হয় যাব
কোন আক্ষেপ নেই না পাওয়ার
ভ্রুক্ষেপ নেই কিছুতেই আর
কী নিয়ে এসেছি যে হারাব!
পৃথিবীর আদি থেকেই তো চলছে
চিৎকার করে জানান দিয়ে আসা
বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া
আবার নীরবে চলে যাওয়া।
কার ঠোঁটে বাঁকা চাঁদের হাসি এলো
কে ফেলল দু’ফোটা জল
কী-ই বা আসে যায় তাতে!
এই যে বাঁচার আকুতি
অর্থহীন প্রাণান্ত হা-হুতাশ
একদিন সবই তো ভেসে যায় ভাটার টানে
বাড়িয়ে দেয়া হাতগুলো শিথিল হয়ে যায়
দিন শেষে যে যার মত একা!
চলে যাওয়াটাই সত্য
পৃথিবীর সাথে মিশে যাওয়াটাই নিয়তি
শূন্যতাও মিটে যায় একদিন
হয়তো কোন প্রিয়জনের বুকে
কদাচিৎ জানান দেয় চিনচিনে ব্যথা হয়ে।
পৃথিবী চলে তার আপন নিয়মে
কারো জন্য বসে থাকে না সময়
সবুজ পাতারা স্বাগত জানায়
সদ্য চিৎকার দেয়া নতুন অতিথিকে।

শতবর্ষী চোখের স্বপ্ন

একটা মৃদু আলোর রেখা
সুতানালি সাপের মত
এঁকেবেঁকে নেচে ওঠে
সরু টানেলের ওপারে।
আহা, জীবন বড় মধুর
কত স্মৃতি জট পাকায় দখিনা জানালায়
নিভু নিভু দীপ জ্বলে উঠতে মরিয়া
একটু অক্সিজেন তার বড় প্রয়োজন।
হুক্কার কল্কিটা অলস পুড়তে থাকে
শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে শতবর্ষী চোখ
কেঁচোর মত শিরাজাগা কুঞ্চিত চামড়ার ভাঁজে
চলে কত গল্পের আয়োজন।

এই সব গল্পের মৃত্যু নেই
একটা অধ্যায় পেরিয়ে নতুন গল্পের শুরু
স্মৃতির মিনারে শিস দেয় প্রজাপতি
সাদা কালো দিন শেষে ফের ডানা মেলে রঙিন ঘুড়ি।

অভিশাপ

মানুষের অভিশাপ কি সত্যিই কানে তোলে বিধাতা
পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি আদৌ হয় ইহকালে
বিধাতার বিধানে নিশ্চয়ই লেখা আছে
কে হাসে পুষ্পের হাসি কে পুড়ে পাপের অনলে!
তবে কেন ইহলোকেই ঠাডা পরে মরেনা তারা
যারা নিরন্ন মানুষের নিরাকার হাহাকারের কারণ
যারা কেড়ে নেয় অগণন মানুষের অধিকার
নির্বিচারে কেড়ে নেয় যারা মানুষের প্রাণ।

অজস্র চোখের জলে অভিশাপের সাগর বয়ে যায়
আমিও ফেলেছি তাতে ক’ফোটা লোনা অভিশাপ
অধীর হয়ে চেয়ে আছি শয়তানের সর্বনাশ দেখতে
অথচ ইবলিসের অট্টহাসি আমাকেই উপহাস করে
তবু আমি তাদের অভিশাপ দিতেই থাকব
জ্বলেপুড়ে হোক ছারখার মুখোশী দানব।

যদি যমদূত এসে দুয়ারে দাঁড়ায়
যদি না থাকতে পারি এই আলো হাওয়ায়
যদি না দেখে যেতে পারি দখলদারের পরাজয়
বিন্দুমাত্র ক্ষতি নেই , তোমরা তো রইলেই
শেষ নিঃশ্বাসেও ছেড়ে যাব অভিশাপের বিষ
ছড়িয়ে দিও তা বাতাসের কানেকানে
তুলে দিও মুক্ত পাখিদের গানে গানে
আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হোক একটাই আবদার
নীল অপঘাতে যেন মরে সব পাপের আড়তদার।

অঙ্গীকার

এইবার এই ঘোর অমানিশা কেটে গেলে
অভিমানী প্রকৃতি যদি ভোলে সব অপমান
যদি তুলে নেয় তার বুকে অসীম ক্ষমায়
জেনে রেখে, আমি হব তার শ্রেষ্ঠ সন্তান।

এইবার এই বিশ্বমহামারির যদি হয় অবসান
যদি পাই একটু আশ্রয় তাঁর করুনার ঝুলিতে
সৃষ্টির মাঝে খুঁজে নেব তাঁর নিরাকার ছায়া
অন্তরে এঁকে নেব তাঁরে প্রার্থনার তুলিতে।

এইবার এই অনিশ্চিত বন্দিদশা শেষে
যদি আলোকিত ভোর ছুঁয়ে দেয় হঠাৎ
আমাদের দুঃস্বপ্নের রাতগুলো মুছে ফেলে
মানুষ হবার অঙ্গীকারপত্রে দেব শেষ দস্তখত।

মুখোশের ভীড়ে স্বপ্নভেজা চোখ

এই অমানবিক পৃথিবীতে
সবই কী কৃত্রিম সবই কী লোক দেখানো বাহানা!
কবরে-শ্মশানে প্রত্যাখ্যাত
বেওয়ারিশ লাশের হিস্যা বুঝে নিতে
যুদ্ধে লিপ্ত কুকুর ও শকুন
করোনারা ভেংচি কাটে আড়ালে
বিশ্বাস উড়ে যায় ঝড়া পাতার মত
অজানা গন্তব্যে।
এই বিশ্বমহামারির দিনে
পৃথিবীর বুকে কালো হরফে লেখা হয় রোজ
অসংখ্য মৃত্যু পরোয়ানা
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় সে তালিকা
লক্ষ-নিযূত মৃত মুখের মিছিলে
বিধাতার তুলিতে আঁকা যদি হয়েই থাকে
আমার মুখখানি
যদি মৃদু পায়ে মৃত্যু এসে
কড়া নাড়ে দুয়ারে আমার
নিশ্চিত জেনে রেখ
রেখে দেব তারে খিড়কির ওপারে
চেয়ে নেব দুদণ্ড সময়।
অসংখ্য মুখোশের ভীড় ঠেলে ঠিক খুঁজে নেব তোমার স্বপ্নভেজা চোখ
সব নষ্টের ভীড়ে এখানে স্বপ্নটাই শুধু শুদ্ধ
তোমার চোখে চোখ রেখে সারা গায়ে স্বপ্ন মেখে
দু’হাত বাড়িয়ে পড়ে নেব আজরাইলের হাতকড়া।

এবার তোরা মানুষ হ

চেহারাটা দেখতে তো বেশ
মানুষ মানুষ লাগে
কাজে ভাঁজে খাসা খাটাশ
জানত কে তা আগে!

চলায় বলায় লেবাসটা বেশ
লোক দেখানো মানবীয়
কাজের বেলায় ষোল আনা
দানবের চেয়েও দানবীয়।

করোনাতে পড়লি মুখোশ
করলি আড়াল আসল রূপ
তাই বলে কী রইল গোপন
তোর ভেতরের নর্দমা-কুপ!

বিশ্ব জুড়ে মরছে মানুষ
মহামারী ভয়াবহ
পশুত্বটা কবর দিয়ে
এবার তোরা মানুষ হ।

মৃত্যু যখন সংখ্যামাত্র

মৃত্যু, সে তো এখন কেবলই সংখ্যামাত্র।

কিছুকাল আগেও মারা যেত একজন মানুষ
তার নাম ছিল পেশা ছিল পরিচয় ছিল
সঙ্গে রঙিন থেকে সাদা হয়ে যাওয়া একখান ছবি।
আর এখন মৃত মানুষেরা শুধুই সংখ্যা
শত, হাজার, লাখ, লাখ-লাখ, অসংখ্য…
মহাত্মনদের নামে যদিও শোকবার্তা হয়
তারও স্থায়িত্ব সামান্য সময়
আরেকটা শোকবার্তা এসে ঢেকে দেয় পুরনোকে।

আমরা প্রতিদিন আড়াইটায় টিভির সামনে বসি
কতগুলো সংখ্যা শুনবার জন্য, শুধুই সংখ্যা
আগে চোখ ঝাপসা হত
বুকটা কেমন ভারী লাগত
বেড়ে যেত নিঃশ্বাসের আদ্রর্তা
আর এখন, পাটিগণিতেই মনোযোগ।

টিভি চ্যানেলগুলোতে অর্থহীন তর্ক।

একদিন হয়তো শোকবার্তাহীন নিতান্তই মামুলি সংখ্যা হব তুমি আমি সে
কেউ হয়তো মনেও রাখবে না
কবে কোন গণকবরে মিশে যাবে সেই সংখ্যাটাও!

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com