রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন

পলাশফোটা রাত্রি: আল-সালিহ সাব্বির- পর্ব ২

পলাশফোটা রাত্রি: আল-সালিহ সাব্বির- পর্ব ২

agooan
agooan

পলাশফোটা রাত্রি উপন্যাসের ১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পাপড়ি মেয়েটার গায়ের রং উজ্জ্বল ফরসা, হালকাপাতলা গড়নের। দেখে রোগা লাগে না ঠিকই কিন্তু রোগা মেয়েদের চেহারায় যেরকম মায়া থাকে সেরকম মায়া আছে ওর চোখেমুখে। চুলগুলো ছড়িয়ে দিলে অপ্সরী অপ্সরী লাগে। চালচলনে খুব স্মার্ট, গুছিয়ে কথা বলে, খুবই বুদ্ধিমতী। নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস। এ ধরনের মেয়েরা সাধারণত অহংকারী হয়। কিন্তু পাপড়ি তেমন নয়; বরং অসম্ভব মিশুক টাইপের মেয়ে। কারো সাথে গল্প শুরু করে দিলে যা বলে সব যেন মনের গভীর থেকে উঠে আসে। বোঝাই যায় ভেতরে অবশিষ্ট কিছু নাই।


পলাশের সাথে পরিচয় হয়ে যায় অনেকটা নাটকীয়ভাবে। পলাশের সততা, সরলতা আর নিয়মানুবর্তিতার গল্প শুনতে শুনতে পলাশের প্রতি একটা টান চলে আসে পাপড়ির। সে ফোন দিয়ে দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে বাধ্য করত বিভিন্নভাবে। পলাশ ভাবত এত ঝামেলা করে লাভ কী? এর চেয়ে একটা কবিতা শুনিয়েই যদি মুক্তি পাওয়া যায় তবে তো মন্দ নয়। তবে তার অবচেতন মন অপেক্ষায় থাকত কখন পাপড়ি ফোন দিয়ে বলবে একটা কবিতা শোনা না!

পলাশ খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। বিনয় যেন চোখ থেকে গলে গলে পড়ে বরফগলা পানির মতো। ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি কবি কুসুমকুমারী পলাশকে নিয়েই লিখেছিলেন কিনা কে জানে! পলাশ হয়তো চুপটি করে বই থেকে বেরিয়ে এসেছে এই পৃথিবীতে। লোকের মুখে-মুখে এখনো শোনা যায়, ‘যে বয়সে বাচ্চারা চুরি করে আম খেত সেই বয়সে ঝড়ে আম পড়লেও সেটা কুড়িয়ে মালিকের বাসায় পৌঁছে দিত পলাশ।’ পলাশের বন্ধুরা যখন জানল যে সে একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে তখন তাদের যেন জ্ঞান হারানোর জোগাড়। ঘুমানোর আগে যেই ছেলেটা এখনো ভূতের গল্প শুনতে গিয়ে আর ভয়ে ঘুমাতে পারে না সে ভালবাসার বোঝেটা কী! পলাশ নিজেও মাঝেমাঝে অবাক হয়ে যায় এসব ভেবে।


পলাশ বিভিন্নভাবে নিজের মনের কথা বোঝাতে চাইত। পাপড়ি শুনতে না-চাইলেও মনে মনে প্রশ্রয় দিত ঠিকই। কেউ একজন কারো জন্য একটু পাগলামো করলে তার মধ্যে ভালোলাগা কাজ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। সেই প্রথম দিনে পলাশের চিরকুট ফিরিয়ে দেয়ার পর পলাশ আর সাহস করে দ্বিতীয়বার ভালবাসি বলার দুঃসাহস করেনি। মেয়েরা অবশ্য সাহসী ছেলেদেরকেই বেশি পছন্দ করে। পাপড়ি বন্ধু হয়ে থাকার শর্ত জুড়ে দিয়েছিল বলেই কি সে বাধ্য ছেলের মতো আর কখনো ভালবাসি বলবে না? সারাজীবনের বন্ধুত্ব আশা করবে আর সেটা বাস্তবায়ন করতে সাহস করে আরেকটাবার ভালবাসি বলবে না! পাপড়ির এতদিনের অভিমান জমে জমে এত বড়ো হয়েছে যে এই পাহাড়ের কাছে তেনজিং আর হিলারি নিতান্তই শিশু। পাপড়ি বুঝে গেছে, এমন সহজ সরল ছেলেকে হয়তো ভালবাসা যায় হার্টের প্রতিটি বিট থেকে কিন্তু এমন গাধাকে এক মূহুর্তের জন্যও সহ্য করা যায় না।
পলাশের নাম-পরিচয়হীন আইডিতে পাপড়ির রিপ্লাই এসেছে। যেটার জন্য অনেক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল পলাশ। কিন্তু এখন আর পড়ে দেখতে ইচ্ছে করছে না। মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত। কখন কী চায় নিজেও জানে না। কিন্তু মন আগেই অনেক কিছু বুঝে যায় যাকে আমরা সিক্সথ সেন্স বলি। পলাশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইনবক্সে ঢুকল। পড়ে না-দেখলে ভালো লাগবে না সেজন্যই হয়তো।
[রিপ্লাই: আমি পলাশকে খুব ভাল করেই চিনি। ম্যাসেজ লেখার এমন ইচ্ছা তাও পরিচয় গোপন করে, এটা পলাশ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না৷ ধরেই নিলাম আপনি পলাশ না, আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, আমি মুখ দিয়ে একটা কথা একবার বের করে ফেললে আর দ্বিতীয়বার ভাবি না কী হবে। আমি যা বলি তাই করি। আমার আর কোনো ফিলিংস নাই তার প্রতি। আপনার যা ইচ্ছে হয় করেন। কিন্তু অনুগ্রহ করে আমাকে কখনো জানাবেন না।]
পলাশ ধন্যবাদ দেওয়ার আর প্রয়োজনীয়তা দেখে না। এটা যে পলাশ সেটা ধরে ফেলেছে ভালো কথা, তাই বলে এভাবে নির্মম নিখুঁত অপমান করবে! সুন্দর সুন্দর স্মৃতিগুলো গুছিয়ে রেখে দিতে হবে। মেয়েমানুষ আসলেই রহস্যময়। পাপড়িকে আরও বেশি রহস্যময় লাগছে পলাশের। এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাইলে হেমায়েতপুর যাওয়া লাগবে নিশ্চিত। আচ্ছা, পলাশ কি পারে না এই পরিচয়হীন আইডি থেকে পরিচিত অপরিচিত মানুষকে চিঠি লিখে চমকে দিতে? সেক্ষেত্রে কারও চিঠির উত্তরের অপেক্ষা করতে হবে না। যেখানে এক্সপেকটেশন নাই সেখানে অল্পেই অনেক খুশি থাকা যায়।

পলাশ কার ফেসবুক স্ট্যাটাসে যেন দেখেছিল, কারো ফ্রেন্ডশিপ যদি সাত বছর পার হয়ে যায় তবে সেই ফ্রেন্ডশিপ কখনো ভাঙে না। পলাশেরও দৃঢ় বিশ্বাস যে এই ফ্রেন্ডশিপ আর কখনো ভাঙবে না। কিন্তু অনেকদিন হল পাপড়ির সাথে পলাশের তেমন যোগাযোগ নেই।
অথচ তাদের একসাথে কতই না স্মৃতি জমে গেছে। একদিন কথা না হলেই পলাশের মন খারাপ হয়ে যেত খুব। ফ্রেন্ডশিপ হারানোর ভয়ে সে তার অনুভূতি আর কখনো প্রকাশ করতে পারেনি। পাপড়ির সাথে শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন অনেক ঘোরাঘোরি করেছে দু’জন। পলাশ খুশি হয়ে গিয়েছিল যে পাপড়ি আজকে কিভাবে এত উদার হয়ে গেল, সে তো একসাথে কোথাও যেতেই চাইত না। পলাশের মনে আশার সঞ্চার হল। কিন্তু শেষ পথটুকু আসার সময় পলাশের ভুল ভাঙে,
–দেখ পলাশ, তুই আমার খুব ভাল ফ্রেন্ড কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সব বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।
–মানে! বুঝলাম না।
–আমার বাসা থেকে পাত্র দেখছে। এই সময় তোর সাথে ঘুরে বেড়ালে কী হবে ভেবেছিস?
–খুব ভাল হবে। তোর বিয়ে হবে না। আমরাও নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়াতে পারব।
–আমি আর তোর সাথে বাইরে আসতে পারব না, পলাশ।
–এক কাজ কর, আমাকে বিয়ে করে ফেল। তাহলে সব ঝামেলা মিটে যাবে। হা হা…
সেদিন পাপড়ি আর একটি কথাও বলেনি। পলাশের ফোন রিসিভ করেনি সারাদিন। পরদিন সকালে রিসিভ করে বলে,
–কেন জ্বালাচ্ছিস আমাকে?
–না জ্বললেই তো হয়।
–ফোন না দিলেই তো হয়।
–আমার ইচ্ছে।
–ওকে ডান। ফোন রিসিভ না করাও আমার ইচ্ছে।
–দেখ, আমার ভালো লাগে না। এমন করিস না প্লিজ!
–তুই বন্ধু থাকতে চাইলে থাক, এর বেশি সম্ভব না। এভাবে জোর করলে আমি সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেব।


পলাশ এর ঘোর কাটে না। ভেবেছিল এতদিনে নিশ্চয়ই পাপড়ি তার মাইন্ড চেঞ্জ করেছে। কিন্তু শেষদিন ছিল বলেই হয়তো অমন ঘোরাঘোরি করে দিনটি স্মৃতিময় করে রাখতে চেয়েছিল মেয়েটা। এক কাপ ধোঁয়া-ওঠা চা খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করার চেষ্টা চালাল পলাশ। এরপর আবার একটা ম্যাসেজ লিখতে বসল–
‘পাপড়ি, তোকে আমার অনেক কথা বলার আছে। আসলে তোকে আমি অনেক ভালবাসি রে পাপড়ি। তোকে ছাড়া থাকতে পারব না আমি। এটাই আমার শেষ কথা।’
এইটুকু লিখেই থেমে গেল সে। নাহ, আজকে লিখবে না কিছু। অন্য একটা প্ল্যান আছে। ম্যাসেজটা দু-তিন দিন পরে পাঠালেও কিছু হবে না।
(চলবে….)

পলাশফোটা রাত্রি উপন্যাসের ১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com