সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০৬ অপরাহ্ন

পলাশফোটা রাত্রি: আল-সালিহ সাব্বির – পর্ব ১

পলাশফোটা রাত্রি: আল-সালিহ সাব্বির – পর্ব ১

agooan
agooan

এক.
“প্রিয় পাপড়ি আপু,
আপনি আমাকে চিনবেন না। আপনার কথা অনেক শুনেছি। কিন্তু আপনাকে কিছু লিখব তা কখনো ভাবিনি। তবে আপনার কথা আব্বুকে বলেছিলাম যেবার আপনি থার্ড প্রফে ঢাকা বোর্ডে ফার্স্ট হলেন। আব্বুর অনেক স্বপ্ন ছিল যে, একসময় আমিও হয়তো বিশাল খ্যাতি অর্জন করব। তাই আপনার সাথে বেশি বেশি মিশতে বলতেন। কিন্তু জানি, আমার দ্বারা আপনার আশেপাশেও পৌঁছনো সম্ভব হবে না।
আপনাকে ম্যাসেজ করার পেছনে একটা মজার গল্প আছে। এটা আমার একটা শখ যে পরিচিত, স্বল্প পরিচিত এমনকি অপরিচিত মানুষকেও আমি নামপরিচয় গোপন করে চিঠি লিখি। কেউ উত্তর দেয়, কেউবা রাগ করে আবার কেউ কেউ পড়েও দেখে না। হঠাৎ করে এমন অপরিচিত মানুষের বড়ো বড়ো ম্যাসেজ দেখে খুব আগ্রহ নিয়ে পড়লেও একেকজনের রিয়েকশন হয় একেক রকম। সেটা ভেবেই আমার খুব হাসি পায়; কেমন যেন আনন্দ হয়।


আপনাকে লেখার কারণ অবশ্য পলাশ ভাইয়া। গত সপ্তাহে তাঁকে একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলাম আর তিনি ভেবে নিলেন যে ম্যাসেজটা আপনার। আর তাই প্রত্যুত্তরে প্রথমে একটা ছোটো একটা রিপ্লাই দিলেন (যা আপনার জন্য হুবহু তুলে দিচ্ছি)। তার এক ঘণ্টা পর আরেকটা দীর্ঘ উত্তর দিলেন (কী উত্তর দিলেন তা আপনাকে বলব না)।


ভাইয়ার রিপ্লাই–‘দেখ পাপড়ি, এটা যে তুই তা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি আমি। আমার চোখ ফাঁকি দেওয়া এত সহজ না, বুঝলি? আই.টি. সেক্টরে আমার গভীর নলেজ। তাই যেখান থেকেই ম্যাসেজ করিস না কেন আমি ঠিকই বুঝে ফেলব যে এটা তুই। আমাকে ছাড়া জানি তোরও ভালো লাগছে না, তাহলে কেন এত লুকোচুরি? সামনে এসে কথা বল, আমি কিছু মনে করব না।’
আপু, আপনাকে আসলে আমি চিঠি লিখছি দুইটা কারণে। প্রথমত, স্যরি এই জন্য যে আপনার যেই চিঠি পাওয়ার কথা ছিল সেটা মজা করতে গিয়ে আমার মেসেঞ্জারে এবং আমি পড়ে ফেলেছি। দ্বিতীয়ত, স্যরি এই জন্য যে আপনাকে চিঠি ফরওয়ার্ড করে দিতে পারছি না। ভাইয়া সত্যি সত্যিই আমাকেই আপনি ভেবেছেন।
আচ্ছা আপু, আপনার মধ্যে কি এমন জাদুকরি জিনিস আছে যে ভাইয়া আপনাকে এত পছন্দ করে। শুনেছিলাম কারো কারো নাকি মেধাবীদের ওপর দুর্নিবার আকর্ষণ থাকে যা একটা মানসিক রোগ। বিশ্বাস করেন আপু, পলাশ ভাইয়ার কিন্তু এই রোগ নেই। উনি সত্যিই আপনার মধ্যে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছেন।
আপু, ভাইয়ার চিঠিটা পড়ে মনে হয়েছে ভাইয়া আপনাকে অনেক পছন্দ করলেও আপনি ভাইয়ার প্রতি কোন আগ্রহ অনুভব করছেন না, যদিও আসল সত্যটা আমি জানি না। আমি এখন যে কথাটা লিখব সেটা যদি মোবাইলে না-লিখে কলম দিয়ে লিখতাম তবে নিঃসন্দেহে আমার হাত কাঁপতে থাকত। ফার্স্ট ইয়ারে ভাইয়া যেদিন হার্টের উপর ডেমো দিচ্ছিলেন সেদিনই ভাইয়ার উপর ক্রাশ খেয়েছিলাম। আপনি যদি সত্যিই ভাইয়াকে ভালো না বাসেন তবে ভাইয়ার এই কঠিন সময়ে পাশে থেকে আমি তাঁর মন জয় করতে চাই। আপনাকে লেখা দীর্ঘ চিঠিটা পড়ে আমার কান্না চলে আসছিল।
আপু, আমি কখনোই কাউকে চিঠি লিখে উত্তরের অপেক্ষায় থাকি না। কিন্তু আপনার এই চিঠির উত্তরের অপেক্ষায় অধীর হয়ে থাকব। যদি উত্তর না দেন তবে ভাইয়ার প্রতি খেয়াল রাখিয়েন।

ইতি
নামহীন কেউ একজন”

পলাশ তার নতুন খোলা পরিচয়হীন ফেসবুক আইডি থেকে মেসেজটা পাঠিয়ে দেয় পাপড়ির ইনবক্সে। সে কার কাছে যেন শুনেছিল যে মেয়েরা ফ্রেন্ডদের সাথেও অন্য মেয়েকে মিশতে দেখলে হিংসায় জ্বলে যায়। পাপড়ির কি এই চিঠি পেয়ে হিংসা হবে নাকি আনন্দের সাথে তাকে এই নামহীন আইডি’র কাছেই তুলে দিতে চাইবে? পাপড়ি আর আট-দশ জন মেয়ের থেকে আলাদা। পলাশ এই মেয়েটির ব্যক্তিত্বের কাছেই বন্দি হয়েছে কিনা কে জানে! নাহলে এত সহজে তো হার মানার পাত্র নয় পলাশ।


ইদানীং পাপড়ির কথা খুব বেশিই মনে পড়ছে পলাশের। প্রথম প্রথম মেয়েটাকে পাগলি পাগলি মনে হতো। সময়ে-অসময়ে ফোন দিয়ে বিভিন্ন ভাবে অতিষ্ট করে তুলত। সে-মেয়েটিই কিভাবে এত গম্ভীর হয়ে গেল পলাশ বুঝতে পারছে না। তার ব্যক্তিত্বের কাছে হেরে যাচ্ছে সবকিছু। পলাশ ফোন না ধরলে সে কি অভিমানটাই-না করত। সেই মান ভাঙানো পলাশের কাছে ছিল এক মুহূর্তের ব্যাপার। ফোন দিয়ে ‘বনলতা সেন’ আবৃত্তি শুরু করলেই মাখনের মত গলে যেত মেয়েটা।

পাপড়ি যখন রাগ করে থাকত তখন এক অদ্ভুত ধরনের আনন্দ হত পলাশের। কেন ভালো লাগত জানে না। হয়তো মানুষকে ভালোবাসার কষ্ট দেয়ার মাঝে আছে এক অন্যরকম আনন্দ। একদিন তো পাপড়ি এত বেশি রেগে গেল যে সে কবিতাটি আবৃত্তি করেও কোনো কাজ হল না। পলাশ প্রথমবারের মতো অবাক হল। মেয়েটাকে যে ভালোবাসে, তা নয়। কিন্তু মনখারাপ ভালো না-হওয়ায় কেমন যেন খারাপলাগা শুরু করল পলাশের। তার মন খারাপ থাকে তো থাকুক তাতে পলাশের কী? সে তো কারো মন ভালো করার চাকরি করে না। পলাশ নিজেকে খুব রিয়েলিস্টিক মনে করে। তার ধারণা প্রেম-ভালোবাসা তাকে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু এই মেয়েটার মন খারাপ সে সহ্য করতে পারছে না। তাহলে কি সে প্রেমে পড়ে গেল? পলাশ জানে না এই সময়ে কি করতে হয়। প্রেমে পড়লে মানুষ কবি হয়ে যায়। পলাশও খাতা কলম নিয়ে বসল–

“প্রিয় পাপড়ি,
পত্রের প্রথমে প্রাণাশেষ প্রীতি প্রেরণে প্রয়াস পাচ্ছি। পর-সমাচার, প্রচন্ড পিপাসায় প্রাণনাশের পূর্বেই প্রেমসুধায় প্রেম-পিপাসার পূর্ণতাপ্রাপ্তির প্রত্যাশায়।

প্রায়শ্চিত্তে,
পাপড়ির পলাশ।
[আমি কিন্তু সব শব্দের প্রথম অক্ষর ‘প’ দিয়ে লিখেছি। কারণ তোমার নামের প্রথম অক্ষর ‘প’।]”

সেই পাগলি মেয়েটা সেদিন হেসে কুটিকুটি হয়ে গেলেও পলাশকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বন্ধু হয়ে থাকার শর্তে একটা ক্ষুদ্র প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছিল।
দীর্ঘ ছয়-সাত বছরে পাপড়ি নিজের মধ্যে কী এমন পরিবর্তন নিয়ে এসেছে পলাশ বুঝতে পারে না। তার কথার কাঠিন্য পাথরকেও হার মানায় এখন। হ্যাঁ মানে হ্যাঁ, না মানে পৃথিবী উল্টে গেলেও না। পলাশ অপেক্ষা করছে। পাপড়ি কী উত্তর দেবে তার এই ম্যাসেজের নাকি কিছুই বলবে না?
(চলবে….)

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
You cannot copy content of this page