রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন

প‌রেশ স্যা‌রের টুনটু‌নি: মু‌হিব্বুল্লাহ আল মাহদী

প‌রেশ স্যা‌রের টুনটু‌নি: মু‌হিব্বুল্লাহ আল মাহদী

প‌রেশ স্যা‌রের টুনটু‌নি - মু‌হিব্বুল্লাহ আল মাহদী - আগুয়ান
প‌রেশ স্যা‌রের টুনটু‌নি - মু‌হিব্বুল্লাহ আল মাহদী - আগুয়ান

গরম বেশী হওয়ায় ত‌ড়িঘ‌ড়ি ক‌রে বাথরু‌মে ডু‌কে প‌রেশ। স্নান সে‌রে টিউশ‌নি‌তে যে‌তে হ‌বে। টিউব‌য়ে‌লের সা‌থে ধ্বস্তাধ‌স্তি ক‌রে এক বাল‌তি পা‌নি সংগ্রহ ক‌রে। তাড়াহু‌রো ক‌রে গ‌া‌য়ে পা‌নি ঢাল‌তে যা‌বে অম‌নি বাল‌তির ভেতর থে‌কে কে যেন স্যা—র ব‌লে ডে‌কে উঠল। চম‌কে উঠল প‌রেশ। বাল‌তির ভেতর ছলছ‌লে দু‌টো চোখ। একটা মে‌য়ের দুষ্টুমী ভরা হা‌সিমুখ।
প‌রেশ ভয় পে‌য়ে যায়। এম‌নি‌তেই সে লাজুক টাই‌পের ছে‌লে। মে‌য়ে দেখ‌লে‌তো কোন কথা নেই। যত দ্রুত পাড় হওয়া যায় তত তার নিঃশ্বাস নি‌তে সু‌বি‌ধে হয়।

প‌রেশ স‌বে বিএ পাশ ক‌রে‌ছে। এমএ পরীক্ষা সাম‌নে। একটা হাই স্কু‌লের খন্ডকালীন শিক্ষক। সুকন্যা তার স্কু‌লের ছাত্রী। বড় বেশী চঞ্চল। ছাত্রী ও ভা‌লো। তার চঞ্চলতার কার‌নে প‌রেশ‌কে ক্লাস নি‌তে গি‌য়ে অনেকটা বেগ পে‌তে হয়।

ক্লা‌সে বেত নেওয়া প‌রে‌শের নী‌তি বিরুদ্ধ। বান‌রের খাচায় খাবার নি‌য়ে গে‌লে যে অবস্থা হয় প‌রে‌শের ক্লা‌সে ডুক‌লে অনেকটা সে রকমই অবস্থা হয়।

তবুও সে রাগ ক‌রেনা। হয়ত এ বয়সটা রাগ করার নয়। বা‌ড়ি‌তে যা‌দের সা‌থে ক্রি‌কেট খে‌লে, আড্ডা দেয় তা‌দের বয়স আর তার ছাত্র‌দের বয়স যে একই রকম। তাই শাসন কর‌তে খুব একটা ভরসা পায় না।

ক্লা‌সে ডু‌কে প‌রে‌শের চোখ দু‌টে‌া‌কে বই থে‌কে খুব একটা সড়া‌নোর সু‌যোগ পায় না। সুকন্যার দু‌টো চো‌খের মায়াবী চাহনীর যথাযত প্র‌তিউত্তর দেবার মত রোমা‌ন্টিক চক্ষু যুগল তার নেই। তাই অসহা‌য়ের মত আস্তে ক‌রে একটা ধমক দেয়; বই‌য়ের দি‌কে তাকাও। তার ধমক বাতা‌সে ইষৎ ধাক্কা দি‌য়ে আবার নি‌জের কা‌ছেই ফি‌রে আসে।

ধমকটা‌কে ক্লাসময় ছ‌ড়ি‌য়ে দেবার জন্য তার একজন সহকারী আছে। তা‌কে কেউ নি‌য়োগ দেয়‌নি। জংগ‌লে যেমন কেউ আগাছার চাষ ক‌রে না প্রাকৃ‌তিক ভা‌বে জন্ম নেয়। প‌রেশ স্যা‌রের সহকারীও নি‌য়োগ ছাড়াই প্রাকৃ‌তিক ভা‌বেই স্বেচ্ছাপ্র‌নো‌দিত হ‌য়ে ক‌র্মে নি‌য়ো‌জিত আছে। প‌রে‌শের ধমকটা শু‌ন্যে মিলা‌নোর পু‌র্বেই প্রচন্ড শ‌ক্তি ব্যা‌য়ে সে ধমকটার পূনরাবৃ‌ত্তি ক‌রে সবাই‌কে চম‌কে দেয়। তার এই শাষন প‌রে‌শের কা‌ছে খুবই ভা‌লো লা‌গে। তার পরও লোক দেখা‌নো একটু রাগ ক‌রে। কিন্তু মায়াবী চোখ দু‌টো যখন বড় করুণ দৃ‌ষ্টি নি‌য়ে স্যা‌রের দি‌কে তাকায় প‌রে‌শের লোক দেখা‌নো রাগও তখন মাথায় থা‌কে না। সুকন্যা‌কে আদর ক‌রে প‌রেশ টুনটু‌নি না‌মে ডা‌কে। এর কারন একটাই। টুনটু‌নি পা‌খি যেমন সারা‌দিন ছটফট ক‌রে। এক জায়গায় স্থির থাক‌তে পা‌রে না। মে‌য়েটাও সেই স্বভা‌বের।

মানু‌ষের চোখ যে শুধু দেখার যন্ত্র নয়। এর যে আরো বহু‌বিধ কাজ করার সামর্থ্য আছে টুনটু‌নির চো‌খের দি‌কে তাকা‌লে যে কেউ সহ‌জেই বুঝ‌তে পার‌বে। প‌রেশ টুনটু‌নির দি‌কে চাই‌তে ভয় পায়। ভয় না ঠিক, লজ্জা পায়।

তাও যখন নি‌জের অজা‌ন্তে চোখ দু‌টো ওর মু‌খোমু‌খি হয় প‌রে‌শের সারা শরী‌রে কম্পন শুরু হয়। ম‌নে হয় তার চোখ থে‌কে বিদ্যু‌তের জ্যো‌তি এসে তার দেহমন সব গ্রাস ক‌রে ফেল‌ছে। প‌রেশ নিরব হ‌য়ে যায়। কথায় জ্বড়তা আসে। অথচ ম‌ঞ্চে দাড়া‌লে প‌রে‌শের বক্তৃতা শু‌নে শ্রোতারা হাততা‌লি দি‌তে গি‌য়ে হা‌তে ফোসকা প‌ড়ে যেত। সেই প‌রেশ এক ছোট্র টুনটু‌নির গুনগুন গান শু‌নে কথার ফুলঝু‌ড়ি ভু‌লে নিথর দা‌ড়ি‌য়ে থা‌কে।

ভাল‌বে‌সে প‌রেশ অভ্যস্থ না। অনে‌কেই তা‌কে ভালবা‌সে। প্রে‌মের প্রস্তাব দেয়। তার ছাত্রী‌দের ম‌ধ্যেও অনে‌কেই। কিন্তু প‌রেশ নিরব। তার নিরবতায় অনে‌কেই রাগ হয়। অনে‌কে তার পৌরুষত্ব নি‌য়েও খোঁচা দেয়। তবুও সে তার নী‌তি‌তে অটল।

কিন্তু টুনটু‌নির প্র‌তি তার একটু দূর্বলতা এসে যায়। কোন দিন প্রকাশ কর‌তে পা‌ড়ে‌নি।

আজ সে চম‌কে উঠে বাল‌তির ভেতর তা‌কে দে‌খে। প‌রেশ বিস্ম‌য়ে প্রশ্ন ক‌রে; টুনটু‌নি!

বাল‌তির পা‌নি গোলাপী ব‌র্ণের মত দেখা‌তে লাগ‌লো। টুনটু‌নি সব সময় গোলাপী রং‌য়ের যে জামা প‌ড়ে; সেই জামা প‌ড়েই এসে‌ছে। সে ধমক দিল ; আমা‌কে উঠা‌বেন না স্যার?

ভ‌য়ে ভ‌য়ে প‌রেশ বাল‌তি‌তে হাত রাখল। মুহু‌র্তে ধোঁয়ায় চার‌দিক অন্ধকার হ‌য়ে গেল। ভ‌য়ে বাকরুদ্ধ প‌রেশ‌ চোখ বন্ধ ক‌রে দেয়া‌লে হেলান দি‌য়ে ব‌সে পড়ল। প্রচন্ড নিরবতা চার‌দি‌কে। ভ‌য়ে ভ‌য়ে চোখ খুল‌লো সে। টুনটু‌নি তার দি‌কে এক নজ‌রে তা‌কি‌য়ে আছে। মু‌খে সেই দুষ্টু হা‌সি।

দুজ‌নের নিরবতা প্রথম ভাংগাল টুনটু‌নিই। স্যার ভয় পা‌বেন না। হয়ত ভাব‌ছেন আপনার বাথরু‌মে আসলাম কিভা‌বে?

প‌রেশ মাথা নে‌ড়ে সম্ম‌তি দিল সে তাই ভাব‌ছে। মু‌খে বলল তু‌মি বাল‌তির ভেতর ডুক‌লে কিভা‌বে? তু‌মি জ্বীন প‌রী নও‌তো!

না স্যার। আমি জ্বীন পরী না। আমি আপনার আদ‌রের টুনটু‌নি। আপনার ছাত্রী। বাল‌তি‌তে থাক‌তে আমার একটু ও কষ্ট হয়‌নি স্যার।
; যা হোক তু‌মি এখা‌নে এলে কেমন ক‌রে?
টুনটু‌নি হা‌সে; আপনার বু‌কের ভেত‌রেই তো ছিলাম। যেই না আপ‌নি একটু আনমনা হ‌য়ে গে‌ছেন, আমি ঝাঁপ দি‌য়ে বাল‌তির পা‌নি‌তে প‌ড়ে গেলাম। একটা কথা বল‌বো স্যার?
প‌রেশ অনুম‌তি দেয় ; বল।
আজ আমার বি‌য়ে। বরযাত্রীরা এসে‌ছে।
প‌রেশ বিস্ম‌য়ে তাকায় টুনটু‌নির দি‌কে; আর তু‌মি এখা‌নে! তাড়াতা‌ড়ি চ‌লে যাও।
; না স্যার। কোন সমস্যা হ‌বেনা। আমার দেহ‌তো এতক্ষ‌নে তা‌দের সা‌থে চ‌লে যা‌চ্ছে। আমি হলাম টুনটু‌নির মন। আপনা‌কে ছে‌ড়ে আমি যে‌তে পাড়বনা। কোন দিন ও না।
প‌রেশ প্রশ্ন ক‌রে; তাহ‌লে সে‌দিন যে তু‌মি অস্বীকার কর‌লে আমা‌কে ভালবাস না।
টুনটু‌নি হা‌সে, সে তো আমি ব‌লি‌নি। টুনটু‌নির মুখ ব‌লে‌ছে। বা‌পের ভ‌য়ে। আমি‌তো সব সময় আপনার ছিলাম আপনারই আছি।

এমন সময় বাথরুমের দরজায় প্রচন্ড শব্দ। প‌রেশ ভয় পে‌য়ে টুনটু‌নির দি‌কে তাকায়। টুনটু‌নি হা‌সে। হাস‌তে হাস‌তে অদৃশ্য হ‌য়ে যায়।

শ‌ব্দের গ‌তি বাড়‌তে থা‌কে। ঘুম ভে‌ঙ্গে যায় প‌রে‌শের। মা ডাক‌তে‌ছে~‌কি‌রে প‌রেশ স্কু‌লে যা‌বিনা?

সে‌দিন স্কু‌লে গি‌য়ে শুন‌তে পায় সব শিক্ষক‌দের দাওয়াত কোন এক ছাত্রীর বি‌য়ে‌তে। প্রচন্ড অনিচ্ছা স‌ত্ত্বেও যে‌তে হ‌লো।

প‌রে‌শের চো‌খের সাম‌নে ‌ভে‌সে উঠ‌লো ছোট্র‌বেলার দিনগু‌লোর কথা। জংগল থে‌কে সন্ধ্যা বেলায় টুনটু‌নি ধরত। পা‌য়ে সুতা দি‌য়ে বে‌ধে খেলা করত। এক সময় টুনটু‌নিটা যখন দুর্বল হ‌য়ে যেত তখন ভাব‌তো পোষ মে‌নে‌ছে। পা‌য়ের বাধন ছি‌ড়ে দিত। অম‌নি কোন এক সময় হা‌তের ফাক দি‌য়ে ফুরুৎ ক‌রে উড়াল দিত শ‌খের টুনটু‌নি। এম‌নিভা‌বে কতবার কত পা‌খি উড়ে গেল। কই এতো কষ্ট লা‌গে‌নি‌তো!

আজ চো‌খের সাম‌নে শত শত টুনটু‌নির উড়ে যাবার দৃশ্য ভাস‌ছে। একটা পা‌খিও তার দি‌কে ফি‌রে চায় না।

আজ যে তার জীব‌নের টুনটু‌নিটা ফাঁ‌কি দি‌য়ে চ‌লে যা‌চ্ছে। হয়ত ঐসব পা‌খির মত সেও আর কোন দিন প‌রে‌শের নাম স্মরন কর‌বে না। ভাঙ্গা সাই‌কে‌লে রোদ বৃ‌ষ্টি ঝ‌রে প‌রেশ মাষ্টার কর্ত‌ব্যের টা‌নে আজীবন ছু‌টে চল‌বে। সন্ধ্যায় কলম খাতায় টুকাটু‌কি ক‌রে ঐ সব টুনটু‌নি‌দের গুনকীর্তন ক‌রে গল্প ক‌বিতা লিখ‌বে।

এসব লিখ‌তে গি‌য়ে আমার ও‌ যে ভীষন লজ্জা লাগ‌ছে। পেশায় আমিও যে একজন শিক্ষক। আমিও তো কারও বাংলা স্যার। ত‌বে আমি প‌রে‌শের মত না।

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com