রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:৩১ অপরাহ্ন

মাটির পুলসিরাতে প্রেমফুলের সুবাস: সৌর শাইন

মাটির পুলসিরাতে প্রেমফুলের সুবাস: সৌর শাইন

বাতাস পেলে নড়েচড়ে ওঠে সাদাচুলগুলো। নড়ে ওঠে কলাপাতা ঘেরা জানালা। ধীর লয় নিঃশ্বাসে বুকের ভেতর একমুঠো হৃদপিন্ড মন্থরভাবে ওঠানামা করে। প্রায় দিনই আসমানের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে বুড়ো আজাদ, দেখে সূর্যাস্ত পেরিয়ে কীভাবে জোনাকির মেলা বসে কামনার লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে। গলার ভেতর কাশি না জাগা অবধি লোকটা এভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়। থোকা থোকা স্মৃতির নুড়ি কুড়াতে কুড়াতে বয়ে যায় কাল, নামে রাত! বেয়ে যায় সুখ দুঃখের তরী! প্রেয়সীকে হারানোর বেদনা ফুরাতে চায় না হৃদয়ের গহীন থেকে।


বুড়ো আজাদের মুখে একগুচ্ছ কাঁটা কাঁটা দাগ, কুঁচকে যাওয়া চামড়া সাক্ষী দেয় যুগ যুগান্তরের। এক টুকরো ভূমিতে একটা নড়বড়ে ঘর। বউ ফুরোবার পর থেকে এই গৃহের উনুনে কখনো আগুন জ্বলে নি, কখনো রান্না হয়নি এক মুঠো ভাত। বুড়ো আজাদ এক নিঃসঙ্গ পথিক, যে পথিক ব্যথা ও কষ্টের ঝুলি কাঁধে বয়ে চলেছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। বিশাল সুবেশী চরের এই গ্রাম থেকে ওই গ্রাম, এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত, মানুষের দুয়ারে গিয়ে তার নিস্পলক চোখের চাহনিতে এক মুঠো ভিক্ষের আকুতি। ভিক্ষের চাল কটা বেঁচে টাকা জমায়, কদিন পরপর কিনে আনে ফুলের চারা। নানাজাতের ফুলের ঝোপে ভরে ওঠেছে ভিটেটুকু।


দূর দূরান্তের গাঁ থেকে ভিক্ষে করে বুড়ো আজাদ ঘরে ফেরে বিকেলে। সন্ধ্যার আগে ছুটে যায় ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে মোলায়েম মাটির সন্ধানে। সেই মাটির কোমল কারুকর্মে সাজিয়ে তোলে অর্চনা দেবীর কবরখানি। প্রেয়সীর কবরের পাশে সুগন্ধি আগরবাতি জ্বালিয়ে বুড়ো আজাদ প্রতিরাতে নিবেদন করে ভালোবাসার নৈবেদ্য, প্রেমের আরতি। কবরটার অবস্থান বুড়ো আজাদের ঘরের ভেতর দখিনপাশে দেয়াল ঘেঁষে জানালার ধারে, যৌবনকালে মাটির বিছানাতে অর্চনাদেবী যেখানে শুয়ে ঘুমাতো। আর ঠিক ডান পাশে শুতো যুবক আজাদ। এভাবে কেটেছে আঠারো বছরের দাম্পত্য জীবন, গোটা সংসারধর্ম। তারপর কেটে গেছে আরো পঁচিশটি বসন্ত। কালের পরিসীমা যতদূরেই যাক না কেন, আজও পাশাপাশি শুয়ে ঘুমানোর প্রতিশ্রুতিতে ব্যতয় ঘটেনি। বুড়ো আজাদ এখনও অর্চনা দেবীর ডান পাশেই শোয়, স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে পরম সোহাগে। জন্মভূমি ছেড়ে দূর বহূ দূরে ছুটে এসে ওদের এই সংসার সাধনা, সামাজিকতার শৃঙ্খল মুক্ত হবার উদ্দেশ্যে। আজ জীবন নিঃশেষের পথে, আয়ু ফুরাবার দ্বারপ্রান্তে, তবু জাগ্রত শপথ ও পরস্পরের প্রেম। প্রেম ও কামের পারস্পরিক মেলবন্ধনে জীবন সুধাময়!
সন্ধ্যে নেমে এলে বুড়ো আজাদ ঘরে মোমবাতি জ¦ালায়, আগরবাতির সুগন্ধি ছড়ায়, কুঞ্জ সাজিয়ে তোলে কাম ও প্রেম পিপাসার মোহনায়। ব্রহ্মপুত্রের মোলায়েম কাদা মেখে সাজায় মাটির ঢিবি যেখানে ঘুমিয়ে আছে অর্চনা দেবী। প্রেয়সীর শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে আদরে আবেগে নিপুণ হাতে ছুঁয়ে দেয় বুড়ো আজাদ। তখন দু’চোখ ভরে নামে নোনাজল। রাত গভীর হয়, আর মাটির ঢিবিতে অজস্র চুমুর ঢেউ তোলে বুড়ো, যেন এক কামার্ত পুরুষ প্রিয়ার শরীরে জাগিয়ে তুলেছে কামনার ঝড়। রাত শেষে ভোর জাগে, কাঁচা মাটির কাম চিহ্ন জড়িয়ে থাকে লুঙ্গি পাঞ্জাবি জুড়ে, সেই আলপনা ও ঘ্রাণ জড়িয়ে ভিক্ষের ঝুলি কাঁধে পথে বেরোয়। এই কামানন্দ অভ্যাস ও তপস্যায় দিন ফুরোয়, দিন আসে।
নিত্যদিনের মতো ভিক্ষুক বেশে হাঁটতে হাঁটতে বুড়ো সাঁতার কাটে স্মৃতির সমুদ্রে। মনে পড়ে পুরনো অজস্র স্মৃতি, গুনগুনে কান্না গলা পর্যন্ত এসে আটকে থাকে। মেঘনা নদীর পাড়ে একদিনের দেখাতে ওদের প্রেম। অর্চনার মিষ্টি হাসি ও চুলের জোড়া বিবুনি এখনো আজাদের চোখে ভাসে। উথলে জাগে কিশোরী চোখের মায়া মাখা আবেগ।


আজাদ ও অর্চনা দু’জন পাশাপাশি গাঁয়ে বাস করত, রসূলপুর ও মনোহরপুর। বাপ-মা মরা আজাদ বেড়ে ওঠে মফস্বল শহরের এতিমখানা মাদ্রাসায়, কৈশোর পেরিয়ে সে কিছুদিন দূর গাঁয়ের মসজিদে ইমামতি করে, পরে সেখানেই কাঠ নকশা শেখার কাজে যোগ দেয়। অন্যদিকে অর্চনা দেবী ছিল ধনী হিন্দু ঘরের মেয়ে। আজাদ গ্রামে এসে সচরাচর দু’দিনের বেশি থাকত না। কিন্তু অর্চনাকে নদীর পাড়ে দেখার পর আর ফিরে যেতে পারেনি। প্রথম দেখায় প্রেম, আবেগ ও কৌতূহল ভরা দুজনের মন। হৃদয় দেয়া নেয়ার পর ওরা বুঝতে পারে হিন্দু-মুসলিমের প্রেম এই সমাজে কতটা অসম্ভবপর। তবুও প্রেম অপরাজেয় হয়ে ওঠে, দুজনের মন থেকেই মুছে যায় ধর্মের বাঁধা। এদিকে সামাজিক নীতি শৃঙ্খলের কাছে এক সময় উন্মোচিত হয় আজাদ ও অর্চনার ভালোবাসা। কি সমালোচনার ঝড়টাই না উঠল দুই গাঁয়ের হিন্দু-মুসলিম পাড়াতে, বাজারে চায়ের দোকান, মসজিদ, মন্দির থেকে শুরু করে চাষাভূষার ঘর অবধি চলল তুমুল আলোচনা। এসব ভেবে বুড়ো আজাদ এখনো বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় করে, রোমাঞ্চিত হয় বার বার। আহা মানব জগৎ, আহা প্রেম!


ভিক্ষের থলে কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে সুবেশী চরের গোরস্থানের কাছে চলে আসে বুড়ো আজাদ। চোখে পড়ে মকবুল মাতুব্বরের কবর। মনে পড়ে অর্চনা দেবীর মৃত্যুর পর এই মাতুব্বর বলেছিল, আজাদ মিয়া পাগলামি কইরো না, ঘরের ভেতর কবর দেওয়ার রেওয়াজ ধর্মে নাই, এইটা ঠিক না, গুনাহ হইবো। এখন পাগলামি করতেছ, পরে ঠিকই বুঝতে পারবা কত বড় ভুল কইরা ফেলছো।
আজাদ তখন মাতুব্বরের কোনো কথাই কানে তোলেনি। বরং অটল থেকেছিল প্রতিজ্ঞায়। বুড়োর পাগলামি অনেকেই মানতে পারেনি। চরের লোকজন জোর-জবরদস্তি করে গোরস্থানে একটা কবর খুড়েছিল। তখন আজাদ বলেছিল, তোমরা ক্যানে, এই বাহুবল দেখাচ্ছো? দেখো, দেখো গোরের ওইদিকে দায়ের মত ধারানি ঢেউ ওঠতেছি, ভাঙন দেখা দেছে, কে জানে কখন কবরগুলাও ভাইঙা লিয়া যায়, তহন এই দ্রেশ্য দেইখ্যা, কেমুন কইরা বাঁচমু? তাছাড়া হৃদয়ের যন্ত্রণা তো কম নয়, আমাকে আমার মতন কইরা বাঁচতে দেও।
বুড়োর বুকফাটা কান্নার কাছে সবাই হার মানে। অর্চনার কবর দেওয়া হলো ঘরের ভেতর।
বুড়ো আজাদের আরো মনে পড়ে, অর্চনা দেবীর মৃত্যুর বছর পাঁচেক পর মকবুল মাতুব্বর বলেছিল, আজাদ মিয়া আরেকটা বিয়ে করো। জীবন সুখ আহ্লাদ ছাড়া চলে না। এই একলা থাকার মানে হয় না, খালি দুই মুঠ খাওন খাইলেই চলে না, শইল-মনের ইচ্ছা পূরণ করতে হয়, নয়তো বাঁচার মইধ্যে লোকসান। আজাদ মাথা নেড়ে বলেছিল, না, তা হয় না মাতুব্বর ভাই, আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, অর্চনাকে কথা দিয়েছি এই জনমে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালবাসবো না। আমার শইল কন আর মন কন, সবই অর্চনার জিম্মায়। এই কথা শোনার পর মকবুল মাতুব্বর আর কিছু বলেনি।
বুড়ো আজাদ নিজের ভেতর তাড়া অনুভব করে, তড়িঘড়ি হেঁটে গোরস্থানের পূর্বপ্রান্তে চলে আসে। চোখে পড়ে পুরনো স্মৃতির ভেতর জন্মানো পলাশ গাছটা, বুড়ো আজাদ বলে, বাবা পলাশ, দেখতে দেখতে তুই কত বড় হয়ে গেলি। বাপ, বলে না ডেকেই দুনিয়া থেকে চলে গেলি। কত্ত বড় হারামি ছেলে, তারপরে তোর মাকেও জগৎ ছাড়া করলি।
আজাদের একমাত্র সন্তান তিন মাস বয়সে অসুখে মারা যায়। অর্চনা ছেলেটার নাম রেখেছিল পলাশ। আর পলাশের ছোট্ট কবরে ভাগ্যক্রমে জন্মায় একটা পলাশফুলের গাছ, যুগ চক্রে গাছটা আজ পরিণত। বুড়োর কাছে এই পলাশ গাছটাই সেই শিশু সন্তান। চোখ ভরে জল নেমে আসে। বুড়ো আজাদ দ্রুত পায়ে হাঁটে, ভিক্ষের থলে নড়তে থাকে।
সুবেশী চরের প্রতিটা মানুষ বুড়ো আজাদকে একনামে চিনে। বউপ্রেমী বুড়ো! অর্চনার কবর গোরস্তানে না দেবার ঘটনা থেকেই এই খেতাব তার ভাগ্যে লেখা। ভিক্ষের জন্য এলে তাকে মুখ ফুটে কিছু বলতে হয় না, তাছাড়া বুড়ো আজাদ কিছু বলেও না। নিশ্চুপ দন্ডায়মান থেকে ফিরে যায়, যে যার মতো একমুঠো চাল থলের ভেতর তুলে দেয়। সকালে ও দুপুরে কারো না কারোর দুয়ারে এক থালা পান্তা বা ঠান্ডা ভাত জুটে যায় ক্ষুধা মেটানোর জন্য। কোনো কোনো দিন বুড়ো আজাদ একবেলা খেয়েই দিন কাটিয়ে দেয়, তবে রাতে কখনো কিছু মুখে দেয় না। যেদিন ঘর থেকে বেরুতে পারে না, সেদিন চলে উপোসকাল।


সুবেশী চরে আজাদ ও অর্চনার ঘর বাঁধার আগে রয়েছে আরো বিস্তর কথা। অর্চনার বাবা কৌশিক রায়ের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল গোটা গ্রাম জুড়ে, মুসলিমদের মধ্যেও তাকে মান্য করত। অর্চনার প্রেম প্রসঙ্গে কৌশিক রায় ওঠে পড়ে লাগেন আজাদকে শায়েস্তা করার জন্য, আজাদের বিরুদ্ধে বিচার আসর ডাকা হয়। সবকিছু আঁচ করতে পেরে এক রাতে ওরা দুজন গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমায় অচেনা পথে। দক্ষিণবঙ্গ ছেড়ে ওরা ঠাঁই নেয় উত্তরবঙ্গে।
রেলগাড়ি থেকে নেমে আজাদ ও অর্চনা দেখতে পায় সদর রোড জুড়ে মানুষজনের ভিড়! দু’জন হাত ধরাধরি করে এগোয় ভিড়ের ভেতর। জানা যায়, দুর্যোগের কারণে অসহায় মানুষজন এখানে জমায়েত হয়েছে। বন্যা ও নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ওপাড়ের কয়েকটা চর নিশ্চিহ্ন, দরিদ্র জনতা বাস্তুভিটা হারিয়ে ঠাঁই নিয়েছে ব্রহ্মপুত্রের এপাড়ে, বাঁধ ও জেলা সদর রোডে। মানুষজনের হাহাকার, শিশুদের কান্না, গৃহপালিত পশুদের ক্ষুধার্ত চিৎকারের আনাগোনা সর্বত্র। স্থানীয় সরকার উদ্বাস্তুদের জন্য খুলেছে লঙ্গরখানা। ক্ষুধার্তদের লাইনে দাঁড়িয়ে আজাদ ও অর্চনা দু’মুঠো আহার পায়। ভাগ্যবরণে ওরাও খোলা ময়দানে ঠাঁই নেয়, গৃহহারা মানুষ জনের দলে।


গণতাঁবুর নিচে শুরু হয় ওদের প্রথম রাত্রিযাপন! সে দৃশ্য মনে হলে এখনো আজাদ দীর্ঘশ^াস ছাড়ে! স্মৃতির পাতায় খুঁজে পায় অর্চনার সেই ক্ষীণস্বর! ‘..করছো কী? করছো কী? কেউ দেখবে তো!’ নীল চাঁদোয়ার তলে সবাই তখন গভীর ঘুমে নিমজ্জিত, আজাদ গভীর প্রেমে ঝাপটে ধরেছিল অর্চনাকে। তখন অর্চনা এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিল! আহা শব্দ! আহা কণ্ঠস্বর!
এসব ভাবতে ভাবতে ভিক্ষের ক্লান্তি নিয়ে বুড়ো আজাদ দিন শেষে ঘরে ফেরে। ভিক্ষের থলে রেখে তড়িঘড়ি করে ছুটে যায় ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। পশ্চিমে তখন সূর্য হেলে পড়তে থাকে। জলের তলে আজাদ বুড়ো নিজের ছবি দেখে বিড়বিড়িয়ে বলে, অর্চনা একবার এসে দেখে যাও আমাকে, পারলে সাথে বেঁধে নিয়ে যাও। অস্পষ্ট শব্দের পাশাপাশি দু’হাত চালিয়ে মোলায়েম মাটি স্তুপ করে হাতে তোলে। ঘরে ফিরে অর্চনা দেবীর কবর লেপতে থাকে একমনে। চোখের কোণে জমে জলকণা!
জেলা সদর রোডের ধারে নীল চাঁদোয়ার তাঁবুতে ওরা প্রায় এক বছর কাটিয়েছিল। মাস দুয়েকের মধ্যে বন্যার পানি নেমে গেলে অনেকেই ভাঙা নিশ্চিহ্ন ভিটেতে ফিরে যায়। যাদের ভিটেমাটি ভাঙনের কবলে পড়েছে, তারাই কেবল সদর রোডের আশপাশে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে। ওদের দলেই মিশে যায় প্রেমের তাগিদে ঘর পালানো আজাদ ও অর্চনা। অসহায়দের জন্য গৃহ নির্মাণে বিদেশি সহায়তায় সরকার দীর্ঘ মেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করে। ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে সুবেশী চর উদ্বাস্তুদের জন্য শত বছরের মেয়াদে ইজারা নেয়া হয়। ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষদের কাতার থেকে সুবেশী চরে একখণ্ড জমি পায় ওরা, তাতেই গড়ে ওঠে নতুন ঘর-সংসার, নতুন বাসর।


চরের সবার সাথেই পরিচয় গড়ে ওঠে আজাদ ও অর্চনার। ওরা যে একজন মুসলিম ও অন্যজন হিন্দু সম্প্রদায়ের সেটাও জানাজানি হয়, তবে তা নিয়ে কারোর কোনো মাথা ব্যথা জাগেনি, বরং সবার একটাই ভাবনা দু’মুঠো অন্ন ও বেঁচে থাকার আশ্রয়। বিয়ে না হলেও সবাই আজাদ অর্চনাকে স্বামী-স্ত্রীই ভেবে নিয়েছে। আর বিয়ে নিয়েও ওদের মধ্যে কোনো বিড়ম্বনা দেখা যায়নি, বরং দু’পয়সা খরচা করে, কাজী ডেকে লোক দেখানো বিয়ে করে নেবার চিন্তা কোনো ভাবেই সাড়া দেয়নি। জনমনে থাকা ধর্মীয় রীতি ও সামাজিক কঠোরতার ভয়ই ওদের ঘর ছাড়া করেছে। তাই একখণ্ড ঘৃণা জেগেছিল এসবের প্রতি। সারাজীবনে ওদের লোকধর্মের রীতিতে বিয়ে না হলেও সংসার ধর্মে ছেদ পড়েনি। বিয়েটা যে সমাজ স্বীকৃতি কেবল, আর ওরা দুজন যখন সমাজ ভয়ে তাড়িত, অস্তিত্ব বিচ্যুত, তখন এই স্বীকৃতির প্রয়োজনীতা ধুলোয় মিশে যায়।
কবরে মোলায়েম মাটির পরশ বুলাতে বুলাতে বুড়ো আজাদ বলে, অর্চনা আমি তোমাকে ছেড়ে কি কোথাও যেতে পারি কোনো সময়েই না। আমার শইলের প্রতিটা অঙ্গ তোমার কথা কয়, তোমার নামে জপ করে।
বুড়ো ভাবে এটা কবর নয়, স্বয়ং অর্চনা শুয়ে আছে। এই তো মাটি মাখা হাত অর্চনার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। সোনালি রঙের শরীর! যেখানে দুজনের প্রেম ও কাম বসত করে নিবিড় চিত্তে। মাটির ঢিবিতে কাঁচা মাটির কারুকর্মে বুড়ো আজাদ অর্চনার দেহ সাজিয়ে তুলতে চায়। কল্পনার চোখে দেখতে পায়, যুগল স্তন, অনাবৃত উদর, চঞ্চলা কটি, অগভীর বাদামি নাভিমূল, উরুর ভাঁজ, যোনিফুলের রূপ ঐশ^র্য। বুড়োর কাঁচা নির্মাণ কল্পিত রূপে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেখানে ছড়িয়ে দেয় রক্তজবা, বেলি, সন্ধ্যা মালতীসহ নানা রঙের ফুল ও সৌরভ।
মধুচন্দ্রিমায় ভরা ঐসব রাতের কথোপকথন মনের ভেতর উথলে জাগে। ঘাম ও প্রেম একত্রে মিশে নিঃশ্বাসের মাদকতা সৃষ্টি হতো। চুম্বন ও শরীর ঘর্ষণে আসতো সুখের জোয়ার। জাপটে ধরা মুহূর্তে যুবক আজাদ বলত, চিরকাল তোমাকে এভাবে জড়ায়ে রাখমু গো। কোনোদিন হাত ছাড়া হতে দিমু না। কৌশিক রায় যতই হন্যি হইয়া বিচরাক না কেন, তোমারে কাইড়া নিতি দিমু না। মরণরেও ডরাই না।
আজাদকে চুমু দিয়ে অর্চনা বলত, যতদিন জগতে বাঁচবা এইভাবে আগলায়া রাখবা। কোনো দিন ফারাগ করবা না।
আষ্টেপৃষ্ঠে শরীর হাতড়ে আজাদ তখন বলে, যতদিন আমার দেহে পরান থাকবো ততদিন তোমারে আদরে সোহাগে বাইন্ধা রাখমু।
অর্চনার দু’চোখে তখন চকচকে। বলত, আমার আগে যদি তোমার মরণ হয় আমি কিন্তু জিন্দা কবরবাসি হইমু, কয়া রাখলাম। পুরানকালের সেই সতীদাহের আমল থাকলে আমিও তোমার চিতায় ঝাঁপ দিতাম।
আজাদ বলত, তুমি আমার জগত সংসারের পুলসিরাত, তোমারে ছাড়া ভবতরী পার হইবো কেমন করে? মরণের কথা মুখে আনবা না। জীবন-মরণ সবখানে দু’জন একসাথে থাকমু।
আজাদের চোখে টপটপ জলধারা নামে। সে তার সাধ্য মতো কথা রেখে চলেছে। এতগুলো বছর কেটে গেল তবু, অর্চনাকে ছেড়ে একটি রাত অন্য কোথাও কাটায়নি। মাটির ঢিবিতে নিজেকে জড়িয়ে খুঁজে নিয়েছে পরম শান্তির নগর।
ঘরের একপাশে রক্তজবা, বেলি, মাধবীলতা ও সন্ধ্যামালতি গাছের ঝোপ। আছে বকুল ও কদম বৃক্ষও। ফুল অর্চনার বড় প্রিয় ছিল, তাই আজ বুড়ো আজাদের বেঁচে থাকা ও জীবনধারণের কেন্দ্রভূমি এইসব মনোআহ্লাদ!
নারী, নদী, বৃক্ষ ও ভূমি! লাবণ্যে, রসে, প্রেমে, প্রেরণায় আবেদনময়ী! নারীর রহস্যময় রূপ ঐশ্বর্য নদীর স্রোতশৈলীর সৌকর্য, বৃক্ষের ফুল-ফল প্রাচুর্য, মাটির মায়া মাধুর্য গোটা জগৎকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যৌবনের জোয়ারে যখন প্রস্ফুটিত হয়, তখন চোখ ফিরিয়ে নেবার উপায় থাকে না। নেশায় আকুল হয়ে নিবেদন করতে হয় হৃদয়ের কামনা। বিলিয়ে দিতে হয় সব ধ্যান তপস্যার ফসল। ভূমির বিচিত্র রূপ জগতের হৃদয় কেড়েছে, হয়তো কোথাও সে পাহাড়, সমতল, বেলাভূমি, মরু, উপত্যকা কোথাও মেরু মঙ্গলময়। আর পৃথিবীর বুকে বুড়ো আজাদের কাছে একখণ্ড ঘরের ভূমিই প্রেম ও কামের বেহেশত। মৃত্যু অবধি তার বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি! মন ও শরীরের অনন্ত শান্তির অবলম্বন। যখন বুড়ো আজাদ রাতভর কবরকে জড়িয়ে ভালবাসার স্রোত সৃষ্টি করে। মাটির কুটিরে জেগে ওঠে অর্চনার প্রাণ, নরোম ভূমি, মধুপূর্ণিমার সাধ! মাটির পুলসিরাত! জেগে ওঠে জীবন ও কামলীলা জপের মজবা, দেহের আকাশে চুমুর সিতারা অঙ্কনের খেলা, শীৎকারের মধুময় ধ্বনি, সঙ্গমের তৃপ্তি, দেহ কাঁপানো দোলনা, পর্দা তোলে কামফুলের পাপড়ি! নিশীথ ফুরিয়ে ভোরের আলো জাগে আর মাটির যোনিফুল হেসে ওঠে কামরসের স্পর্শে। উঠোন থেকে ছুটে আসে প্রেমফুলের সুবাস!

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
You cannot copy content of this page