শনিবার, ১১ Jul ২০২০, ০২:০১ পূর্বাহ্ন

সায়ন্থ সাখাওয়াতের গল্প: কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলি

সায়ন্থ সাখাওয়াতের গল্প: কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলি

সোলেমান মিয়ার চোখের সামনে একটা আলোর ঝিলিক খেলে যায়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে, সত্যিই আল্লাহ্ মেহেরবান। শেষমেশ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগটা পাওয়া গেল । স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের মুখটা দেখার সুযোগ পেতে যাচ্ছে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে!


পৃথিবীতে এই দু’টি মুখের চেয়ে প্রিয় আর কী আছে তার! মা মারা গেছেন সেই কবে। তারও আগেই গত হয়েছেন বাবা। বড় ভাইটা স্ট্রোক করে বিদায় নিল গত বছরই । সেই ভাই-ই সোলেমান মিয়ার ইতালি যাওয়ার সব ব্যবস্থা করেছিল। একমাত্র ভাইকে শেষ দেখাটাও দেখতে পারেনি। মেয়ের মুখটাই এখন তার সকল সুখের আধার। ভিডিও কলে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেই মা’র কথা মনে পড়ে সোলেমান মিয়ার। একদম দাদীর মুখের সবটুকু আদল নিয়ে এসেছে মেয়েটি। সোলেমান মিয়াও মেয়েকে মা বলেই ডাকে। তার যে একটা নাম আছে সেটাও ভুলে গেছে। পাঁচ বছরে মেয়ের সঙ্গে সাকুল্যে চার দফা দেখা হয়েছে তার। বছরে একবারই দেশে যাওয়ার সুযোগ পায়। মাঝখানে এক বছর যেতে পারেনি। এই বছরের মধ্যেই স্ত্রী ও মেয়েকে ইতালিতে নিয়ে যেতে পারবে। কাগজপত্র রেডি হয়ে গেছে। তবে করোনা ধকল কাটিয়ে ইতালির অবস্থা যে কী দাঁড়াবে সেটা নিয়ে শঙ্কিত সোলেমান। পরে কী হয় সে চিন্তা এখন করে লাভ নেই। আপাতত বাড়ি ফিরতে পারছে এটাই বড় কথা।


মেয়েটাকে এইবার বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে সেই আনন্দে চোখ ভিজে আসে সোলেমানের।
সোলেমান কৃতজ্ঞতা অনুভব করে আকরাম আলীর প্রতি । বাংলাদেশের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর চাচাতো বোনের ছেলে। মামার জোর শুধু দেশেই কাজে লাগে না। বিদেশ বিভুঁয়েও কাজে লাগে। তা না হলে এই দুর্যোগের দিনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে ইতালি থেকে দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করা কী চাট্টিখানি কথা! আকরাম আলীর জন্যই আজ ছিয়ানব্বই জন মানুষ এই ভুতুড়ে দেশ ছেড়ে সোনার বাংলায় যাওয়ার সুযোগ পেল। কপালে মৃত্যু লেখা থাকলে হবেই। তবে তাও যেন দেশের মাটিতে হয়। সে সুযোগটা তো মিলবে! সোলেমান মিয়া মনে মনে আকরাম আলীর জন্য একটা মানত করে। বাড়ি ফিরেই ভালো একটা ছাগল কিনে এতিমখানায় দান করবে সে। এতিম পোলাপানের কথা নাকি আল্লাহ্ বেশি শুনেন। তাদের দিয়ে আকরাম আলীর জন্য দোয়া করাবে সোলেমান।

ইতালি থেকে দোহা হয়ে ঢাকায় পৌছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সোলেমান মিয়া। যদিও অনেকেই উৎকণ্ঠায় মরে যাচ্ছে । বাড়ি যেতে দেবে কিনা সেই চিন্তায় অস্থির তারা। কেউ একটা কাশি দিলেও সবাই সেদিকে ঘুরে তাকায় কেমন একটা সন্দেহ নিয়ে। সোলেমান মিয়া এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিল। গত দুদিনে কাশি আটকানোর একটা কৌশল রপ্ত করে নিয়েছে সে। যখনই গলাটা একটু খুসখুসে ভাব হয়, অমনি মুখে রুমাল চেপে ধরে উষ্ণ প্রশ্বাস ছেড়ে আবার তা নাক দিয়ে টেনে নেয়। নাকে, গলায় এক ধরণের ওম ওম ভাব লাগে। ফলে তার কাশিটা আর শব্দ করে বের হয় না। এর মধ্যে অবশ্য কয়েকবার ওয়াশ রুমে গিয়ে নাকের স্প্রে দিয়েছে। আগে থেকেই এলার্জির সমস্যা আছে সোলেমান মিয়ার । সেটা সে জানে। বিশেষ করে ডাস্ট এলার্জি । ঢাকায় পা রাখা মাত্রই হাঁচি কাশি শুরু হয়ে যায় তার । এটা প্রতিবারই হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই কোন মতেই হাঁচি কাশি দিতে চায় না সে। তাই আগাম এতো ব্যবস্থা । ইমিগ্রেশনের অপেক্ষমান লাইনে দাঁড়িয়ে দোয়া ইউনুস পড়ে বুকে ফু দেয় সোলেমান। এই দোয়া ইউনুস নবীকে মাছের পেট থেকে রক্ষা করেছিল। সোলেমান সেই দোয়ার বরকতে শুধু ইমিগ্রেশনটা পার হয়ে কোয়ারেন্টাইন এড়িয়ে নিজের বাড়ি পর্যন্ত যেতে চায় । প্রয়োজনে হোম কোয়ারেন্টাইন নেবে। তবুও মেয়েকে দূর থেকে তো দেখতে পাবে। মেয়েও তাকে দেখবে। মজার মজার গল্প বলে কয়েক হাত দূর থেকে মেয়েকে হাসাবে । হাসলে গালে যে টোল পড়ে তা দেখবে মুগ্ধ হয়ে। আর কী চায় সে!

শেষ পর্যন্ত কোন দোয়া দরুদই কাজে লাগেনি সোলেমান মিয়ার। কষ্ট করে হাঁচি কাশি চেপে রেখে কোন ফায়দা মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী কড়া ভাষায় বলে দিয়েছেন, বিদেশ থেকে যারাই আসবে সবাইকেই কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে। এরপর আর কেউ ভিন্ন চিন্তা করবে, সেই সাহস এ দেশে কারো নেই। তার কথা মানে আইন।


আশকোনা ক্যাম্পে গিয়ে অনেকেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা থাকতে রাজি হয়নি। থাকা, খাওয়া, পানির সমস্যা । পাঁচ ফুট দূরে দূরে বেড। প্রতি বেডে মানুষ। ডানে তাকালে দু’টো অচেনা চোখ। বাঁয়েও তাই। এই পরিস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন। এক যুবক গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে, এই আমরাই দেশটার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সাহায্য করছি। কোটি প্রবাসী বছরে দেড় হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ পাঠাই। আমাদের গালভরা এক নাম দিয়েছে, রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আর সেই আমাদের সঙ্গে এই আচরণ! একটু ভালো খাবার, একটু ভালো থাকার ব্যবস্থা, একটু পরিচ্ছন্ন বাথরুমও কী আমরা পেতে পারতাম না?


একজন মোবাইলে অনলাইন রিপোর্ট বের করে চিৎকার দিয়ে বলছে, এই দেখেন। দেখেন এক হালারপুতে কী কইছে। কয়, প্রবাসীরা নাকি দেশে আইলে নবাবজাদা হয়ে যাই। আমরা নাকি ফাইভ স্টার হোটেলের খাবার চাইছি।
আরো কয়েকজন সেখানে হুমরি খেয়ে পড়ে। দেখছে কে বলেছে এই কথা। একজন বলল, এই হালারপুতে তো কোন মানুষই না। মন্ত্রী হইল কেমনে!

এই সব আলোচনায় কোন আগ্রহ নেই সোলেমান মিয়ার। সে সহজভাবে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে এই কোয়ারেন্টাইন জীবন। কবে যেন শুনেছিল, ধর্ষণ যখন অনিবার্য, তাকে উপভোগ করাই শ্রেয় । সোলেমান মিয়াও আশকোনা ক্যাম্পের অমানবিক জীবনযাপনকে উপভোগ করার চেষ্টা করে। শুধু সকাল বেলা যখন টয়লেটে যাওয়ার লাইনে দাঁড়াতে হয়, সেই সময়টাই তাকে বেশি পীড়া দেয়। পঁয়ষট্টি বছরের এখলাসুদ্দিন সাহেবের বহুমুত্র রোগ আছে। তাই তাকে আগে সুযোগ দিতে গিয়ে আজ অবশ্য সোলেমান মিয়ার পা বেয়ে স্যান্ডেল অব্দি প্রস্রাব পড়েছে। ধরে রাখতে পারেনি। কিন্তু সেটা কেউ দেখেনি। মানির মান আল্লাহ্ই রাখে।
এখানে সবার হাতেই মোবাইল। আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে কথা বলে সবাই। সোলেমানও বলে। মেয়ের সঙ্গে রোজ ভিডিও কল দিয়ে কথা বলে। ক্যাম্পের ভেতরের গণরুমের অবস্থা দেখে মেয়েটা খিল খিল করে হাসে। একবার পাশের বেডের আলতা মিয়া ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তার লুঙ্গিটা কোমরে উঠে গিয়েছিল। সে অবস্থা ভিডিওতে দেখে মেয়ের সে কী হাসি। মেয়েটা যেভাবেই হাসুক, তার গালে কী যে মন ভোলানো টোল পড়ে। সোলেমান মিয়া তখন কোন কথা শুনে না। শুধু চেয়ে থাকে।
আতিক সাহেবের এক আত্মীয় পুলিশের কনেস্টবল। আশকোনা ক্যাম্পে তার ডিউটি। তার সাহায্য নিয়ে একদিন আতিক সাহেবের বউ এসে দেখা করে গেছে।
বউ যাওয়ার পর আতিক সাহেব অবশ্য সোলেমানকে জিজ্ঞেস করেছিল, কী সোলেমান ভাই, ভাবী আইবো নি? তাইলে ব্যবস্থা কইরে দেই।
সোলেমান বলে, না ভাই। পরে আবার বউটারে যদি ভাইরাসে ধরে!
হ। আপনার বউয়ের ছবি দেইখ্যা মনে হইল বেজায় সুন্দরী । তারে দেখলে ভাইরাসেরও লোভ ওইতে পারে। হো হো করে হেসে উঠে আতিক সাহেব বলে, আরে মিয়া, তোমার ভাইরাস হইলে বউরে ভালো রাইখ্যা লাভ কী? তুমি মইরা গেলে তো বউরে আরেক ভাইরাসেই খাইবো। তাতে তোমার লাভ কী?
আতিক সাহেবের কথা শুনে সোলেমান মিয়ার চোখে মুখে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠে। ইচ্ছে করে পাছার ওপর কষে একটা লাথি দিতে। গত কয়েকদিনে সে খেয়াল করে দেখেছে, এই লোকটা সব কিছুকেই শেষ পর্যন্ত যৌনতার দিকে টেনে নিয়ে যায়।
সোলেমান মিয়ার যে ইচ্ছে করে না তা নয়। কিন্তু তার ভয় লাগে। যদি বউয়ের শরীরে করোনা বাসা বাঁধে! তাহলে তো মেয়েটাও রক্ষা পাবে না। এই ঝুঁকি কিছুতেই নেবে না সোলেমান মিয়া। তাই বউ আসার আগ্রহ দেখালেও সে কড়া ভাষায় বলে দিয়েছে, অসম্ভব। আর তো মাত্র কয়েকটা দিন। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। এইবার ইতালি ফিরতে অনেক দেরী হবে। বউ-মেয়ের সঙ্গে অনেক দিন কাটাতে পারবে ভেবে একটা সুখ সুখ ভাব অনুভব করে সোলেমান।

গণকোয়ারেন্টাইন রুমের সব চেয়ে দুষ্ট ছেলে সিয়াম। তার কাজ শুধু ফেসবুকে কে কি লিখেছে সেগুলি শব্দ করে পড়ে সবাইকে শোনানো। তিন বেড দূর থেকে সিয়াম বলে, ওই সোলেমান ভাই। শুনছেন নি? ইতালি থেকে জামাই বাড়ি আসছে শুনে এক বউ পালিয়ে গেছে বলে পত্রিকায় রিপোর্ট হইছে। ভাগ্যিস আপনি সরাসরি বাড়ি যান নাই। এই কথা শুনে সবাই হাসির কোরাস ছড়িয়ে দেয়।
এর মধ্যেই কেউ কেউ সরকারের ব্যবস্থাপনারও সমালোচনা করে। প্রায় তিন মাস আগে চায়নার উহানে এই ভাইরাসটি ধরা পড়ে আস্তে আস্তে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার তো এটাকে প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। তবুও কেন করল না সে প্রশ্নও তোলে কেউ। টেস্টের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে কিট নেই। স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিতদের সুরক্ষা পোষাক নেই। তিন মাস সময় পেয়েও শুধু নেই আর নেই।
সিয়াম তার ফেসবুকের ডায়ালগ আউড়ে চলে, সরকার তো এতোদিন কাউন্ট ডাউন আর আতসবাজির উৎসবে ব্যস্ত ছিল। তাই এই দিকে খেয়াল দিতে পারে নাই। এখন পরিস্থিতি খারাপ দেখে একটা টাসকি টাসকি ভাব উঠছে। তাদের সিলেবাসে ছিল শুধু ১৭ মার্চ। এক বছর ধরে পড়ছে ১৭ মার্চ । আর প্রশ্ন আসছে করোনা। টাসকি না খেয়ে উপায় কী! এই কথা শুনেও সবাই হেসে উঠে। কিন্তু মাঝ পথেই থেমে যায় সিয়ামের হাসি। তার মুখে থমথমে ভাব ভর করে। বলে, একটা খারাপ খবর আছে।
সবাই এক অজানা উৎকণ্ঠা নিয়ে তার দিকে তাকায়।
করোনায় আক্রান্ত একজন রোগী মারা গেছেন । বাংলাদেশে করোনায় প্রথম মৃত্যু। আর ইতালিতে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা চায়নাকে ছাড়িয়ে গেছে। ডজনের বেশি চিকিৎসক মারা গেছেন ইতিমধ্যেই।
আতিক সাহেব সিয়ামের কথা শুনতে শুনতে নিজের মোবাইলেও অনলাইনে পত্রিকার নিউজগুলো দেখছিলেন। তিনি বললেন, কিন্তু মন্ত্রী তো বলছেন, বাংলাদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে আছে।
সোলেমান মিয়ার থাই থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত শিরশির করে তেলা পোকার মতো কী যেন নেমে যায়। আস্তে আস্তে উঠে টয়লেটের দিকে হাঁটতে থাকে। পেছন ফিরে দেখে মেঝেতে কোন ফোটা গড়িয়ে পড়ল কী না। পড়েনি দেখে আশ্বস্ত বোধ করে। ইদানিং যে কী হয়েছে! প্রস্রাবটা আটকে রাখা যাচ্ছে না। এখান থেকে বের হয়েই একজন ইউরোলজির ডাক্তার দেখাতে হবে।
ইউরেনালের ভেতরে প্রস্রাব করতে গিয়ে তার মন্ত্রীর কথা মনে পড়ে। হঠাৎ করেই ইউরেনালের মুখটার আদলটার জায়গায় ওই মন্ত্রীর মুখটা ভেসে ওঠে। মনের সমস্ত ঘৃণা মূত্রনালি দিয়ে বেরিয়ে এসে সেখানে পড়ে।

আশকোনা ক্যাম্পের গণকোয়ারেন্টাইন রুমে আজ থমথমে নীরবতা । সিয়াম ফেসবুক থেকে কোন হাসির স্ট্যাটাস বের করে শব্দ করে পড়ছে না। সবার চোখে মুখে কেমন একটা আতঙ্ক ভর করেছে। এক রাতের মধ্যেই এখলাসুদ্দিন সাহেব ও আতিক সাহেবের জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট প্রকাশিত হয়ে পড়ল। দু’জনকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের দুজনেরই ডায়াবেটিস আছে।
আতিক সাহেবের বউ যে লুকিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করে গেছেন সে খবরটাও ইতিমধ্যে চাউর হয়ে গেছে । প্রশাসনের লোকজন গেছে তার বাড়িতে। তাদের বাড়ির সব সদস্যকে হোম কোয়ারেন্টাইন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সঙ্গ-নিরোধ ও একঘরে করে রাখা হবে অন্তত ১৪ দিন।
গতকালই টয়লেটে যাওয়ার সময় এখলাসুদ্দিন সাহেবের কাছেই দাঁড়িয়েছিল সোলেমান । এখলাসুদ্দিন সাহেব তার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুরব্বি মানুষ । দুর্বল । তাই কিছু বলেনি সোলেমান। তার ভয় ভয় লাগতে শুরু করে। ইতিমধ্যে এখলাসুদ্দিন সাহেবের থেকে করোনা বাসা বাঁধেনি তো তার শরীরে! সোলেমানের গলাটায় কেমন চুলকানী অনুভূত হয়।
সোলেমানের এই এক সমস্যা । চিকেনপক্সের রোগী দেখলে শরীর চুলকায়। মনে হয় তার তখনই সারা শরীরে পক্সের গুটি উঠে যাবে। চোখ ওঠা রোগীর লাল চোখে তাকালেও একই অবস্থা হয়। নিজের চোখ চুলকাতে থাকে।


সোলেমান মিয়া ভেবেছিল, সে রকম কোন রিফ্লেক্স থেকেই তার গলাটা চুলকাচ্ছিল। ভার ভার ঠেকেছিল। কিন্তু তার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত করে রাত পোহানোর আগেই করোনার সকল লক্ষণ এসে হাজির হয় তার গায়ে ।
সোলেমান মিয়াকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সিয়াম অভয় দিয়ে বলে, একদম চিন্তা কর না সোলেমান ভাই। তোমার কিচ্ছু হবে না। তুমি ইয়ং। ডায়াবেটিস নাই,অন্য কোন রোগ-বালাইও নাই। তোমার ভয় নাই। সাধারণ সর্দি জ্বরের মতোই ভালো হয়ে যাবে এটা।
সোলেমান বউয়ের মোবাইল নাম্বারটা সিয়ামকে দিয়ে বলে, আমার কথা জানিয়ে দিও। মেয়েটাকে নিয়ে আসতে বলবা। মেয়েটারে খুব দেখতে মন চায়। দূর থেকে একটু দেখব শুধু। কাছে আসতে হবে না।

ঢাকা শহরটা এতো অচেনা লাগছে! জনমানবশূন্য। কোলাহল নেই। গাড়ির হর্ন নেই। কবরের নিস্তব্ধতা। গোটা শহরটাই কী এক গণকবরে পরিণত হল! এই শহরে যতবার এসেছে, কাক আর কুকুরের আধিক্য চোখে পড়েছে সোলেমান মিয়ার। আজ কোন কাকের ডাক নেই। কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ পর্যন্ত নেই। সব দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় শুধু লাশ আর লাশ। এতো মানুষ মরল কিভাবে বুঝে আসে না তার। এতো লাশ! জীবনে কখনো এক সঙ্গে একটার বেশি লাশ দেখেনি সে। আর আজ অসংখ্য লাশের ভীড়ে একমাত্র জীবন্ত মানুষ সোলেমান। কিন্তু তার কোন ভয় লাগছে না। বরং মায়া লাগছে মৃত মানুষগুলোর জন্য । তারা হয়তো জানাজাও পায়নি। কে দেবে জানাজা! কোন মানুষ তো নেই! আচ্ছা, একা একজন মানুষ কী জানাজা পড়তে পারে? এই বিধানটা জানা নেই সোলেমানের। একা পড়া গেলে সে সবার জানাজা পড়ে দিত। এই শহরের সব মানুষ কী মারা গেছে! কেউ বেঁচে নেই? সোলেমানই কী এই শহরের একমাত্র জীবন্ত মানুষ? বেঁচে থাকলে তারা কোথায়? নাকি মৃত স্বজনের লাশ নির্জন রাস্তায় ফেলে বাকিরা ঘরে বসে বাঁচার চেষ্টা করে যাচ্ছে? এটাকেই কী বলে লক ডাউন? লক ডাউনের বাংলা কী? মৃত্যুপুরী! হঠাৎ সোলেমান মিয়ার সন্দেহ হয়, সে বেঁচে আছে তো! নিজের চুল ধরে টান দেয়। কোন ব্যথা পাচ্ছে না। টেনে ছিড়ে ফেলতে চায়। কোন ব্যথা নেই কেন! শরীরের সব জোর জড়ো করে টান মারে।
আর তখনই এক নারী কণ্ঠ চেঁচিয়ে ওঠে, কী করছেন, কী করছেন! পাইপটা খুলবেন না।
তারপর কয়েকজন এসে তার হাত দুটো বেঁধে দেয় বেডের সঙ্গে। এরা কারা, সে কোথায়, কিছুই বুঝতে পারে না। এরা কী মানুষ! নাকি ফেরেস্তা? সবাই এমন পোষাক পড়েছে কেন! সারা শরীর ঢাকা। চোখটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। সোলেমানের মনে পড়ে নীল আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদে যাওয়ার পোষাকের কথা। এরা কী ভিন গ্রহের কেউ? নাকি মৃত্যুপরবর্তী জীবনের কোন অধ্যায় শুরু হল!

সোলেমান মিয়ার কাছে এইবার আস্তে আস্তে সব স্পষ্ট হতে শুরু করে। আশকোনা ক্যাম্পের কথা মনে পড়ে। এখলাসুদ্দিন, আতিক, সিয়াম, টয়লেটের সামনের লাইন, সব মনে পড়ে। স্ত্রী ও মেয়ের মুখটাও মনে পড়ছে । কতদিন মেয়েটাকে দেখা হয়নি! তবে কতদিন আইসিইউতে আছে মনে করতে পারছে না সে।

সোলেমান মিয়ার জ্ঞান ফিরেছে দেখে একটু আশাবাদী হয়ে ওঠেন চিকিৎসক। যদিও ফুসফুস এখনো কাজ করছে না পুরোপুরি। তাকে ভেন্টিলেশনেই রাখতে হচ্ছে । কিন্তু গত দুদিনে ভাইটাল প্যারামিটারগুলো স্ট্যাবল আছে। দুয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো আইসিইউ থেকে এইচডিইউতে সিফ্ট করতে পারবে।
এর মধ্যে সোলেমান মিয়ার স্ত্রী ও মেয়ে এসে দেখে গেছে তাকে। কাঁচের ওপাশ থেকে দেখা। সোলেমান মিয়া তাকিয়ে ছিল অনেক্ষণ। অভিমানে বুক ফেটে যায়। তাকে কেন এই কাঁচের ঘরে আটকে রাখা হয়েছে! ঝাপসা কাঁচের ওপাশে মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে আর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার। এক সময় দু’টো মুখ আরো ঝাপসা হয়ে আসে। যেমন দিনে দিনে ঝাপসা হয়ে এসেছে মায়ের মুখ। সোলেমান মিয়া তার মায়ের মুখটি মনে করার চেষ্টা করে। আচ্ছা, চলে যাওয়ার সময় কী মায়ের চুল পেকেছিল? মনে করতে পারে না সোলেমান। সব কেমন ঝাপসা হয়ে আসে তার। মেয়ের মুখটাও ঝাপসা হতে হতে এক পর্যায়ে আর দেখতে পায় না। ইচ্ছে করে চিৎকার দিয়ে বলে, মা রে, একবার একটু হাসি দে। শেষবারের মতো তোর গালের টোল দুটো দেখি! কিন্তু সে চিৎকার তার আর দেওয়া হয় না । আস্তে করে বন্ধ হয়ে যায় চোখ দুটো।

আশা জাগিয়ে এভাবে হঠাৎ চলে যাবে সোলেমান মিয়া, সেটা চিকিৎসকদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। কিছুক্ষণের মধ্যেই টিভি স্ক্রলে ভেসে আসে ব্রেকিং নিউজ, করোনা আক্রান্ত আরো একজনের মৃত্যু।

ঢাকা, ২৩ মার্চ ২০২০

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com