শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন

শাহিন চাষীর পদাবলি

শাহিন চাষীর পদাবলি

একটি কালো ঘোড়া

একটি কালো ঘোড়া
বুকের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমায় নীরবেই ধাবমান,
বাতাসে জ্যামিতিক হাহাকারের বুদবুদ!

মনটা কাঁদছে খুব–
তোমার হাত ধরে হাঁটতে জ্যোৎস্নার উপকূলে;
অতঃপর ইচ্ছে– তোমার হাসিতে ভিজি,
তোমার সংগীতে ভরে নিই মন- প্রাণ–
নিঃশব্দে দেখুক চেয়ে ঘুমহীন বিস্তৃত আকাশ।

ইচ্ছেরা ডানপিটে–
তোমার খোঁপাকে সাজাই সুরভিত প্রেম ফুলে;
মুখে আঁকি সোহাগের চন্দন,
হৃদয়ের ওমে ভরে দিই ও হৃদয়
তারপর তোমার ছোঁয়ায় হয়ে উঠি সবুজ ঘাস।

অনুভবে শূন্যতা!
লোমকূপে- লোমকূপে গোপনে অরণ্য আগুন;
দূরত্ব বাড়ায় পাঁজি কর্কট কাল,
দীর্ঘশ্বাস ফেলেই ঝরে যায় স্বপ্নদল,
একান্ত প্রার্থনায়– সুস্থ, সবল, উচ্ছল, পৃথিবী।

একটি কালো ঘোড়া
কেবল মাড়িয়ে চলে নরম প্রশান্তি, কুসুম সুখ;
অনুভূতির কোষে ঊর্ধ্বমুখী যাপিত অসুখ।

অভিব্যক্তি

ধর্মসভায় বহুবার–
রাত জেগেই খুঁজে ফিরেছি বেহেশতের টিকিট,
এখনো খুঁজছি নিত্যদিন নানান আচারে।

রোগ- শোক সহ্য করি,
আরো সহ্য করছি– আঘাত, অবজ্ঞা, উপহাস;
বুকের পাঁজরে সংক্ষুব্ধ চিতা,
হৃদয় গহনে উন্মাতাল রক্তের সমুদ্র,
অশ্রু বলে উদাস হেসে–
স্বর্গের পটভূমি পর্দার আড়ালে চিরকাল!

আমি জানি না–
স্বর্গ আসলে কোথায়, কোনখানে, কতটা দূরে;
জগৎ জানবে না কোনদিন
স্বর্গ আমাকে নিয়েছে কী অন্তপুরে?
অদৃশ্যের হিসাব কেবল অদৃষ্টেই জমা থাক।

বেহেশতের নিশ্চায়ন আমি পাইনি,
তবে একটি কালো বিড়াল
হাতে ধরিয়ে দিলো- রাষ্ট্র প্রদত্ত মৃত্যু উপহার;
এবার খুঁজবোই ঠিক স্বপ্নের স্বর্গদ্বার।

সূর্যস্নান

আজকে আকাশ নেমে এসে
শান্ত স্বরে বললো কথা মৃদু হেসে:
কেঁদেই যদি অশ্রু নদী চোখের কোণে,
আলোর প্রভা দেখা তবে কোন্ সে ক্ষণে!
জীবন জানো, সত্য মানো– এখন, এবার;
হাত দুটো নয় যন্ত্র কেবল দুচোখ মোছার।

চলতি পথে সবুজ ঘাসে
প্রেম লুকিয়ে বললো আধেক উপহাসে:
হাহুতাশে, দীর্ঘশ্বাসে কাটলে সময়,
কোমল হাসি ঠোঁটের পরে কী করে রয়!
জগৎ দেখো, বাঁচতে শেখো টপকে বাধা;
কণ্ঠে কেন ব্যথার স্বরলিপি সাধা?

চটুল নদী কলস্বরে
বললো যেন শক্ত করে বিনয়ভরে:
কষ্ট পিয়ে, জ্বালা নিয়ে যদি পাথর
মিলবেনাতো নৃত্য- গীতের রঙিন আসর!
হৃদয় খোল, তীরকে ভোল, ছুটে চলো;
সময় সচল বলেইতো রাত সকাল হলো।

সুরে- সুরে গানে- গানে
বনের পাখি বললো ডেকে কানে- কানে:
সবুজ মাখা তরুর শাখা যখন হারায়,
ঝোপে হলেও নিতে যে হয় নীড়কে সাজায়।
চরণ বাড়াও, গ্লানি মাড়াও বীরের মতো
পৃথিবীটা ঠিক তখনই অবনত।

হাওয়ায় নেচে রঙিন ফুলে
আমায় ডেকে বললো কথা দুলে- দুলে:
সুবাস ছড়াও ভূবন ভরাও উদারতায়,
নয় ভাবনা কে রাখলো গুজে খোঁপায়।
কারণে বা অকারণে দুঃখ আসে,
সুখকে পেতে দুঃখ উড়াও আর আকাশে।

ভোমর দলে গুঞ্জরণে
দুয়ার ঠেলে বলে গেল আপন মনে:
মিথ্যে জ্বরায় বিষন্নতায় থাকলে বসে
জীবন পাহাড় মনে- মনে আপনি ধ্বসে।
স্বপ্ন মাখো, স্বপ্ন আঁকো হৃদয় মাঝে,
চাঁদ না জ্বলুক আসে জোনাক ক্লান্ত সাঁঝে।

মনোযোগে সবার কথা
সব শুনেছি দাড়ি, কমা, কোলন, যথা–
কে বা গেলো, কী বা এলো– সকল ভুলে
কাটছি সাঁতার আপন মনে জীবন কূলে।
অশ্রু- ব্যথা, নীরবতা যাচ্ছে দূরে
একটি বাঁশি বাজছে যেন মধুর সুরে।

নীরব গর্জন

অদ্ভুত অন্ধকার
পৃথিবীর বুকের উপর বেপরোয়া বুনোলতা,
মহাকালের তারে যন্ত্রণার শাহানা!

আমি দেখছি–
ঈশ্বরের চোখ শাহীতক্তে উন্মাদ- বেসামাল;
বাতাসে জীবনের গুড়ো,
মৃত্তিকায় রক্তের মাতাল নির্ঝরিণী,
শূন্যের বিস্তীর্ণ উপকূলে–
সম্প্রীতির কাব্য
ভালোবাসার অমিয় সুর।

আমি দেখছি–
পাষণ্ডের ব্যাকরণেই দেব- দেবী মনোযোগী;
ফুলেরা পিষ্ট পায়ের তলায়,
শাদ্বলে গোপনে বালিয়াড়ের অঙ্কুর,
কেবলই থেমে আসে–
সবুজের কোরাস
নদীদের ঠুমরি, খেয়াল…

আমি দেখেছি–
মানবে ভুলে যাচ্ছে মানুষ হবার সহজ পাঠ;
বুকের অতলে শ্যেন- শ্বাপদ,
চোখের গভীরে শুধুই উলঙ্গ মোহ,
ধ্বংসের নেশায় উদগ্রীব–
উসখুস আগুন
ভয়ঙ্কর বোমা, বারুদ…

নিরেট অন্ধকার–
কেউটের ফণায় নিত্যদিন সমুদ্র সাইক্লোন;
বাতাসে একটানা বিলুপ্তির গর্জন!

আমরা

আমরা ঘুমোচ্ছি কবরে,
আমরা পুড়ছি শ্মশানের জ্বলন্ত চিতায়,
আমাদের নামে অকৃপণ বরাদ্দ–
অশ্রু, ব্যথা, দীর্ঘশ্বাস, মৃত্যু।

বিচিত্র রঙে, মিষ্টি সুবাসে বন ভরা ফুল,
আমাদের চোখে ধুসর পৃথিবী!
মায়াময় সুরে পাখিরা গায় সবুজ বনে,
আমাদের মনে কেবল শূন্যতা!
নদীর কল্লোলে ধ্বনিত আশ্চর্য উপহাস!

আমরা দেখি মুখোশের সাধু,
আমরাও কালে কালে সুদক্ষ অভিনেতা–
ক্ষেদ ও ক্ষুধা চেপে হাসি,
ঘৃণাতেও বলি– ভালোবাসি,
ভেতরে ভেতরে হৃদয়ে প্রবল রক্তক্ষরণ।

আমরা কাগুজে বাঘ,
আমরা অন্ধকারে বসেও আলো আঁকি
আর নিঃশব্দে- নীরবে
ভাগ্যের লাশ কাঁধে পথে হাঁটি।

গহীনের কথা

খুব করে ভাবি,
ছোট – বড় অবসরে ভাবনা সমুদ্রে ডুবসাঁতার
সমীকরণ ক্রমশ বহুপদী, অসীমপদী…

ফি বছর দেশে দেশে
আদমশুমারী, পশুশুমারী অথবা কৃষিশুমারী
গ্রাফের রেখায় সবকিছু ঊর্ধ্বমুখী;
বিপরীতে কিছু প্রাণ–
ফসিলের যাদুঘরে কেবলই ইতিহাস!

মনের গভীরে প্রশ্ন
হয় ব্যাঙাচি নয় প্রজাপতি অথবা জলপোকা–
জীবন সংখ্যায় ধর্মতত্ত্ব কতটা যৌক্তিক?
তখন চারিদিক দ্বীপের মতো
কুয়াশার ওড়নায় নিবিড় অন্ধকার!

খুব ইচ্ছে করে
ন্যূন একবার সযত্নে জীবনশুমারী করা হোক
যেখানে স্পষ্ট হবে স্বর্গ, নরক, পুনর্জন্ম…

একটি মুখ

একটি মুখ
এ চোখের প্রেক্ষাগৃহে শৈল্পিক চলচ্চিত্রময়,
অনুভবের বুকে নানাবিধ আলোড়ন।

সেই মুখ
মুহূর্তেই ঢেকে দেয় শরৎ দ্বাদশীর পূর্ণ চাঁদ
জোছনা মাখা কিশোরী ঢেউ
অথবা অবিরল রঙের হাস্যময়ী ফুল।

সেই মুখ
এক চিত্রকরের অপরূপ কল্পনার আভাস
কোন কবির একান্ত নিঃশব্দ প্রেম
আমার নিঃশ্বাসের সুনিবিড় আরাধনা।

সেই মুখ
অজস্র নক্ষত্রের শোভায় শান্ত জ্যোতির্ময়
সুকুমার ভোরের শৈল্পিক জলছবি
আটপৌরে আবীরের একান্ত খেলাঘর।

সেই মুখ
সারাক্ষণ সাজাই অভিমানের বিচিত্র রঙে
শব্দের চন্দনে, উপমার কুমকুমে–
ভালোবাসার ঘায়ে ক্ষরিত রক্তকণায়।

সেই মুখ
নীরবেই রয়েছে মিশে বিস্তৃত অস্তিত্ব ঘিরে
আমার স্বপ্নে, আমার কল্পনায়–
অনুভূতির কোষে, জীবনের মোহনায়।

একটি মুখ
দৃষ্টির দ্রাঘিমা জুড়েই প্রশান্ত সুরমার ঢেউ,
আমার চেতনায় রঙিন পৃথিবী এক।

একটা যুদ্ধ চাই

আমি একটা যুদ্ধ চাই,
একটা যুদ্ধ আমি চাই– অস্ত্রহীন।
অস্ত্র মানেই– ভয়ানক বিস্ফোরণ,
বিস্ফোরণ মানেই– রক্তের স্রোত,
রক্তের স্রোত মানেই– ঝরে পড়া জীবন,
জীবন ঝরা মানেই– বিপন্ন পৃথিবী,
বিপন্ন পৃথিবী মানেই– সভ্যতার বিলুপ্তি,
সভ্যতার বিলুপ্তি মানেই– অস্ত্রের বিজয়,
অস্ত্রের বিজয় মানেই– মানুষের পরাজয়।

তারচেয়ে যুদ্ধ হোক–
মগজে শাণিত বিবেক আর মননের।
মননের ছোঁয়ায় ক্ষুরধার হোক বোধ,
বোধের জাগরণ মানেই– অস্ত্র বেকার,
অস্ত্র বেকার মানেই– পৃথিবী স্বর্গ,
পৃথিবী স্বর্গ মানেই– মানুষের বিজয়,
মানুষের বিজয় মানে– শান্তির আগমন,
শান্তির আগমন মানেই– ভাবনাহীন সময়,
ভাবনাহীন সময় মানে– রৌদ্রও জোছনাময়।

আমি একটা যুদ্ধ চাই,
আমি একটা যুদ্ধ চাই– তবে, তা অস্ত্রের নয়।
যুদ্ধ হোক প্রতিটি মানুষের একান্ত প্রান্তরে,
যুদ্ধ হোক আপনার সাথে কেবল আপনার,
যুদ্ধ হোক– বিবেকের, বোধের আর মননের,
শান্তিপূর্ণ ভয়ানক যুদ্ধ শেষে–
পৃথিবী হোক একটি উদ্যান– রঙিন পুষ্পময়।

মতিভ্রম

ভয়ানক নিঃসঙ্গতার হাত ধরে, আজকাল পথ হাঁটি একা! কখনো
বোসে থাকি চুপচাপ– মাঠের পারে, নদীর ধারে, অপুষ্পক-
সপুষ্পক গাছের ছায়ায়; দৃষ্টির দ্রাঘিমায় চলচ্চিত্রময় তুমি–
নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্যে আর আবীরের কোমলতায়।

আমি চেয়ে থাকি সুদূর আকাশে; বোষ্টমী মেঘে উড়ে চলে পরিয়ায়ী
ডানায়; অথচ– চোখের মাঠে তোমার ছায়া আশ্চর্য– অবাক–
উদাসীন মৌনতায়।

স্বভাবের নিয়মেই উন্মাদ নদী– কলরোলে, ঢেউয়ের নৃত্য কলায়;
তীরে পাখিদের ব্যস্ততা, উড়ে ধূসর ডানার ডানপিটে গাঙচিল;
অথচ– আমি দেখি শুধু তোমাকে– সেই স্বপ্নের রঙ মাখা
ভালবাসার জলসায়।

অদূরে দোলে ফুল– উদাসী হাওয়ায়, ফুলের ঠোঁটে অপূর্ব মায়াময়
হাসির লিরিক; আসে মধুপ, আসে প্রজাপতি– কত বিচিত্র খুশির
বাহানায়! সেখানেও আমি খুঁজে পাই তোমাকে, ঘুম ভাঙা ভোরের সুকুমার স্নিগ্ধতায়।

আরো দূরে পাহাড়, চঞ্চল ঝর্ণা– চির শৈল্পিক; প্রশান্ত জলধারার
মতো আনমনে হেঁটে যায়– এক অচেনা, যৌবতী সাঁওতাল;
দৃশ্যপটে তোমার উপস্থিতি– কখনো নীরব অভিমানে, কখনো
আবার উন্মাদ জোনাকির আবেগী উন্মাদনায়।

জ্বলে ওঠে চাঁদ- তারা; জেগে ওঠে ঝিঝি দল– সুরেলা কোরাসে;
পৃথিবী সহসা আটপৌরে কিশোরী বধূ এক– প্রলম্বিত জোছনার শাড়িতে;
আমি দেখি তোমাকে– এই হৃদয় বেদীতে দেবীর মহিমায়!

যেদিকে তাকাই, যা কিছু দেখি– সবখানেই তোমার উপস্থিতি;
আমি ছুটে যায় কৌতুহলে, আমি ফিরে আসি দীর্ঘশ্বাসে;
আমি খুঁজে পাই ব্যথার সঞ্চিতি এই জীবনের একান্ত জাদেজায়!

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com