বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:১৮ পূর্বাহ্ন

আকিব শিকদারের অণুগল্প

আকিব শিকদারের অণুগল্প

দু’টানায় দিনযাপন

বাবার ক্যান্সার। গলায় ব্যান্ডেজ, ব্যান্ডেজে রক্ত। এগারোটি থেরাপিতে চুল সাফ। চামড়ায় কালো দাগ। বিদেশে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখালে হতো। টাকা কোথায়…

বউকে ডেকে জানতে চাই- “কী করতে পারি?” বউ বলে- “যা ভালো মনে হয় করো।” বাবা যখন যন্ত্রণায় কুঁকিয়ে উঠে, চিংড়ি মাছের মতো দলা পাকিয়ে যায়, বড়ো মায়া হয়।
সিদ্ধান্ত নিলাম বাড়িটা বেচে দেবো। কিন্তু, বউ সন্তান নিয়ে থাকবো কোথায়! এদিকে বাবার মৃত্যু যন্ত্রণা, ওদিকে একমাত্র ছেলেকে অকূল সাগরে ফেলা।

চিকিৎসার অভাবে বাবা মরলে লোকে বলবে- “কেমন ছেলে! বিনাচিকিৎসায় বাবাকে মারলো।” বাড়ি ভিটা বেচে দিলে কুৎসা রটবে- “কেমন বাপ! সন্তানের কথা ভাবলো না!”
অসুস্থ বাপ বাড়ি বিক্রির গুঞ্জন শুনে বলেছিলো- “আমি আর কদিন! তোরা সুখে থাক বাবা, নাতিটার খেয়াল রাখিস।”

কার খেয়াল রাখবো, নাতিটার? নাকি অসুস্থ বাবার? ভাবতে ভাবতে কাঁচের গ্লাসে বেলের শরবতে চামচ নাড়ছিলাম। হাত পা কাঁপছে, মুখ ঘামছে। শরবতে তিন ফোটা বিষ মিশিয়ে দিয়েছি আমি। তিব্র বিষ, মুখে নিলে মৃত্যু।
মনে পড়লো ছোট বেলায় ম্যালেরিয়া জ্বরে সতেরো দিন ছিলাম হাসপাতালে। চিকিৎসার খরচ যোগাতে বাবা তার প্রিয় মোটরসাইকেলটি বেচে দিয়েছিলো।
কই… একবারও তো বিষমাখা চকলেট খাইয়ে মেরে ফেলার কথা ভাবেনি। হাতের চামচ থেমে গেলো।

বাবার বানানো বাড়ি ভিটা বেচেই বাবাকে বাঁচাবো। পরক্ষণেই মনে পড়লো ছেলের পড়াশোনা, বউয়ের আবদার, সংসারের নানা খরচ।
বেলের শরবতে বিষ। না… বাবার হাতে কিছুতেই বিষের গ্লাস ধরিয়ে দিতে পারবো না।
বাবা কতো স্নেহে মানুষ করেছে আমাকে। শহরে রেখে শিক্ষিত করেছে, মোটা অঙ্কের ঘুষে চাকরী জুটিয়েছে, তার হাতে তুলে দেবো বিষের গ্লাস! বিষমিশ্রিত শরবত পিরিচে ঢেকে বাবার বিছানার পাশে রেখে চলে গেলাম দূর। যেন কিছুই জানি না, জানতেও চাই না। যেন বাড়ি থেকে পালাতে পারলেই বাঁচি, এমনকি পৃথিবী থেকেও…

আমার ছেলেটা গিয়েছিলো বাবাকে ঔষধ খাওয়াতে। রুগির পথ্য আপেল কমলা আঙুরের বেশি অংশ নাতিকে সস্নেহে খেতে দিতো বাবা, আজ দিলো শরবত ভরা গ্লাস।
নাতি এক চুমুক মুখে নিয়েই মেঝেতে ঢলে পড়লো। তারপর…
বাবা বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, ছেলে মেঝেতে পড়ে আছে নিস্তেজ। কী করবো! হায়… কোন দিকে যাবো আমি…!

ভালোবাসায় অন্ধ

ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়; জন্মান্ধের চেয়েও অন্ধ। ঊর্মি একজনকে ভালোবাসতো। মুমূর্ষু রুগীর মতো বেহুঁশ ভালোবাসা। ছুটির দিনগুলোতে দু’জনে কতখানে ঘুরে বেড়িয়েছে…

ফেসবুকে পরিচয়। ছেলেটা প্রাইভেট ব্যাংকের কেশিয়ার। তিন মাস বাদে জেনেছিলো বউ আছে। বিশ্বাস করেনি। একটা মেয়ে তাকে ফোনে পরিচয়ে বলেছিলো আফসারের স্ত্রী, সে ভেবেছে আফসারের প্রাক্তন প্রেমিকা তাদের মসৃণ সম্পর্কে ফাটল ধরাতে চায়। আফসার বলেছিলো তার এক বান্ধবী প্রতারণার ফাঁদ পেতে জীবনটা ছাড়খার করে দিতে চাইছে। ঊর্মি মেয়েটার কান্নাজড়ানো আহাজারি শুনতে চায় না বলেই কল এলে ফোন অফ করে রাখতো।

একদিন ওরা পালালো। বুক ভরা সংসার বাঁধার স্বপ্ন। পালিয়ে দু’দিন হোটেলে কাটালো। তৃতীয় ও চতুর্থদিন কাটালো কক্সবাজারের লোনা জলে। পঞ্চমদিন রাঙামাটির পাহারচূড়ায়। সিনেমার মতো নাটকীয় লাগছিলো সব। ষষ্ঠদিনে তারা গেলো আফসারের গ্রামে। সেখানে সত্যিই তার বউ আছে, আছে দু’বছরের একটা সন্তান।

ঊর্মির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। হঠাৎ ইলেক্ট্রিক্যাল শকে যেমন তন্দ্রা ভাঙে। তার ডিমবিক্রেতা বাবা গত ছয়দিন দোকান খোলেনি, পরিচিত জনদের মুখ দেখানোতে লজ্জা। তার গৃহিনী মা মুখে কিছু নেবে তো দূরের কথা, চুলাই জ্বালায়নি। নিজের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে বুঝলো মেয়েটা, ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়।

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
You cannot copy content of this page