বৃহস্পতিবার, ১৬ Jul ২০২০, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন

পলাশফোটা রাত্রি: আল-সালিহ সাব্বির – পর্ব ৩

পলাশফোটা রাত্রি: আল-সালিহ সাব্বির – পর্ব ৩

পলাশফোটা রাত্রি: আল-সালিহ সাব্বির- পর্ব ২

তিন
পলাশ বসে আছে কার্জন হলের সামনে বিকেল ৪টা থেকে। আসার সময় অনেকগুলো কাঁঠালচাঁপা আর তিনটা লাল গোলাপ নিয়ে এসেছে। কাঁঠালচাঁপা পাপড়ির খুব পছন্দের বলেই ধারণা তার। কোনো একদিন পাপড়ি বলেছিল ‘নীল রঙের কাঁঠালচাঁপা চুলে গুঁজে বাচ্চাদের মতো ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করছে’। দুঃখের বিষয় নীল রঙের কাঁঠালচাঁপা কোথাও পাওয়া গেল না। তবে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখেছে কাঁঠালচাঁপা নীল রঙেরও হয়। কোনো একদিন নীল রঙের কাঁঠালচাঁপা হাতে নিয়ে এসে বলবে ‘তোমার জন্য এনে দিতে পারি ১০১টা নীল কাঁঠালচাঁপা’। নিশ্চয়ই কোনো একদিন তার ফুলবাগানে নীল কাঁঠালচাঁপা চাষ করবে সে। তখনও কি পাপড়ির ইচ্ছে করবে চুলে কাঁঠালচাঁপা গুঁজে রাখতে?
আচ্ছা, পাপড়ি যদি জিজ্ঞেস করে গোলাপ মাত্র তিনটা কেন? অনেক কম নিয়ে আসায় অপরাধ বোধ হচ্ছে এমন ভাব করবে। তারপর তিন গোলাপের গল্প বলে চমকে দেবে তাকে। ফুলগুলো একটা শপিং ব্যাগে রাখা। এর অবশ্য দুটো কারণ আছে। পাপড়ি যেন বুঝতে না পারে আগেই দূর থেকে, হঠাৎ তাকে চমকে দেওয়া যাবে। তাছাড়া সে কখনো কারো জন্য এভাবে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেনি, শপিং ব্যাগে থাকায় কেউ বুঝতেও পারবে না।


কিন্তু পাপড়ি এখনো আসছে না কেন! সন্ধ্যা হয়ে এল। নাকি দিনের বেলায় শাড়ি পড়ে বের হতে লজ্জা পাচ্ছে কে জানে। আপাতত গোধূলিবেলার অপেক্ষায় থাকা যাক। বাস্তববাদী মেয়েরা এতো লাজুক হয় না; কে কী ভাবল তার পরোয়া করে না। কিন্তু পাপড়ি বাস্তববাদী হয়েও লাজুকলতা। সেজন্যই হয়তো দেরি হচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে এক সুললিত কণ্ঠ শুনে ভাবনায় ছেদ পড়ল।
–এক্সকিউজ মি ভাইয়া, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?
প্রথমে একটু ভড়কে গিয়ে পরক্ষণেই সামলে নিল নিজেকে। কিন্তু লজ্জায় লাল হয়ে গেল পলাশ,
–না, তেমন কিছু না!
–এক কাজ করেন, আমার কাছে পানির বোতল আছে। আপনি একটু খেয়ে নেন; তারপর আপনার ব্যাগটাতেও ছিটিয়ে দেবেন মাঝেমাঝে। নয়তো আপনার গলার পাশাপাশি ব্যাগ-বাগানও শুকিয়ে যাবে।
–আপনি তো অনেক স্মার্ট! কথাও বলেন সুন্দর করে। কিভাবে বুঝলেন যে ব্যাগে ফুল আছে? যাহোক, আপনাকে ঠিক চিনলাম না।
–আমার পরিচয় জেনে আপনার কাজ নাই। আমি অনেকক্ষণ থেকেই লক্ষ্য করছি আপনাকে। ফুল ছাড়া এখানে কেউ এভাবে অপেক্ষা করে না। তাছাড়া আপনি বারবার ব্যাগের দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিলেন যে-কেউই সন্দেহ করবে যে কিছু একটা আছে। কাছে এসে বুঝতে পারছি, ফুল রাখছেন। ফুলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কি এমন যায় আসত? এত ভীতু ছেলে আমার একদম পছন্দ না।
–আপনার পছন্দ-অপছন্দে আমার কোনো যায় আসে না। আসলে আপনি কী চান বলেন তো? কেউ পাঠিয়েছে নাকি আপনাকে?
–আমি একজন ব্রোকার, খাঁটি বাংলায় দালাল বলতে পারেন। যাদেরকে বেশি ভালনারেবল মনে হয় তাদেরকে এই কার্ড পৌঁছে দেয়াই আমার কাজ। আপনি চলে যাওয়ার সময়ই হয়তো দিতাম কিন্তু এতক্ষণ অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না। অনেকদিন থেকেই আছি তো এই লাইনে, আপনার ফেইট আমি বুঝে গেছি। রাখেন এই কার্ডটা, কাজে লাগতে পারে। আর শোনেন, আপনি অনেক কিউট আছেন। যদি ইচ্ছে হয়, কল দিয়েন, এই কার্ডে আমার নম্বরটা নিজ হাতে লিখে দিয়েছি। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে।
পলাশ কার্ডটা হাতে নিয়ে নির্বাক হয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। ততক্ষণে মেয়েটি হনহন করে হেঁটে চলে গেছে। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তার। এই মেয়ে তাকে একটা রিহেবিলিটেশন সেন্টারের কার্ড দিয়ে গেল কেন? তাকে কি পাগল মনে হয়েছে মেয়েটির! নাকি মেয়েটিই পাগল? নয়তো তাকে এত্তগুলা কথা শুনিয়ে দিয়ে গেল কেন! আবার পরোক্ষভাবে প্রোপোজও করে গেল! রাগে-দুঃখে কার্ডটি এমনভাবে দূরে ছুঁড়ে ফেলল যে যেন মনে হল সেটা সে অন্য গ্রহে ছুড়ে দিল।
পলাশ তার সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে আজকে অপেক্ষা করছে পাপড়ির জন্য। তার ধারণা পাপড়ি অবশ্যই আসবে। পলাশ অল্প কথায় একটা চিরকুট আর একটা নীল শাড়ি পাঠিয়েছিল এক ফ্রেন্ডকে দিয়ে। সে চিরকুটেই লেখা ছিল যে আজকে অপেক্ষা করবে সে।

পাপড়ি,
তোকে যে কতটা পছন্দ করি তা তুই ভালোভাবেই জানিস। আমাদের বন্ধুত্বের এই ক্রান্তিলগ্নে একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই। আমি চাই আমাদের বন্ধুত্বের পূর্ণতা। তোর প্রত্যেকটা পদচারণায় কতটুকু মুগ্ধতা মিশে থাকে তা তুই নিজেও জানিস না। ভালোবাসি বলেই হয়তো এমন লাগে। আমি তোকে বিয়ে করে সবচেয়ে কাছের বন্ধু হতে চাই। আগামী শুক্রবার বিকেলে কার্জন হলের সামনে এই শাড়িটি পড়ে চলে আসিস। তোকে নতুন করে বরণ করে নেব। রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করব। যদি না আসিস তবে ধরে নেব, আমি ভুল ছিলাম। আর কখনো ফিরে তাকাব না; কোনোদিনও না।
ইতি
পলাশ

রাত ৯টা বেজে গেছে। অপেক্ষার দীর্ঘতম এক ঘন্টা এখনো বাঁকি আছে। এত রাতে আর বের হবে বলে মনে হচ্ছে না। মানুষ আশা করে সূর্যালোকের সমান কিন্তু নিরাশ হবার পর বোঝে তার প্রচেষ্টা প্রদীপ শিখার সমানও ছিল না। পলাশের আশার প্রদীপ নিভুনিভু করছে। দশটা বেজে গেলেই ধপ করে নিভে যাবে। অভিমানে কাঁঠালচাঁপাগুলি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলেছে। রিহেবিলিটেশন সেন্টারের কার্ড ফেলে দিয়েছিল বলে আফসোস হচ্ছে। অসংখ্য অসম্ভব সুন্দর স্মৃতিগুলো সে কি একা একা ভুলতে পারবে? পারবে না। কার্ডটি খুঁজতে লাগল আনমনে। এই সময় ফোন বেজে উঠল। তাহলে কি সে অবশেষে আসছে? খুশিতে চোখ টলমল করছে; এখনি হয়তো অঝোর ধারা ঝরবে। এ যে খুশির কান্না।
–কই তুই?
–আমি জানতাম তুই না এসে পারবি না।
–দেখ পলাশ, আমি তোর কাগজটা একটু আগে দেখেছি। আগে দেখলেও আসা সম্ভব ছিল না। আমি হয়তো খুব ভালো একটা ফ্রেন্ডশিপ হারাতে যাচ্ছি যে-কারণে খুব খারাপ লাগবে কিন্তু তোকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না রে।
–আসিসনি তাতেই বুঝেছি। ফোন দিয়ে একই কথা আবার বলার কী আছে। ভালো থাকিস। বাই।
পলাশ বুঝতে পরছে না এখন কী করা যায়। রিক্সায় রাতের ঢাকা খুব চমৎকার লাগে। আজকে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোতে মায়া-মায়া লাগছে না। বাতাসে কেমন উৎকট গন্ধ পাচ্ছে। মাটি থেকেও উঠছে ভ্যাপসা গরম।

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com