বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন

গোপন কবর: সাঈদ কামালের গল্প

গোপন কবর: সাঈদ কামালের গল্প

love story by saeed kamal agooan webmag সাঈদ কামালের প্রেমের গল্প

দু মিনিট হয় মধ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। বিকেল। এই সময় রাস্তায় প্রচুর গাড়ী থাকে কিন্তু আজ একটি গাড়ীও নাই। খুব খারাপ লাগছে।কত সাধ করে এলাম-গাড়ীর নিচে চিরদিনের জন্য তলিয়ে যাব-তা আর হল না। তা মনে করে মাথার চুল ছিঁড়ি। সাদা চুলগুলি বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। দুজন পুলিশ এলেন, ধমক দিয়ে বললেন-‘এই বুড়া সমস্যা কী? এদিকে
আসো?’ ওদের একজন আমাকে টেনে নিয়ে রাস্তার এক পাশে দাঁড় করায়। জিজ্ঞেস করে -‘বাড়ি কোথায়? কে কে আছে? নাম কি?’
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি।কথা বলি না।
অন্য একজন জিজ্ঞেস করেন,-‘বোবা নাকি, কথা না বললে বাড়িতে পৌঁছে দেব কেমনে?’
আমি চুপ করে থাকলে ওরা আমাকে গাড়ীতে তুলে। থানায় নিয়ে আসে। পথে আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।
ওদের সামনে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে -‘কিছু বলবেন? না হলে জেলে ভরে দেব। বুড়া বয়সে পুলিশের মাইর খেতে না চাইলে বলে ফেলুন। রিমান্ডে দেব পনের দিনের। আত্মহত্যার ইচ্ছা চিরতরে মরে যাবে।’

‘আমার অপরাধ কী? আত্মহত্যার কী স্বাধীনতা নাই?’-এক পলক ওদের দিকে তাকাই।
‘ও,বাবা!বুড়া তো কথা বলতে পারে!’ -দুজন মুচকি হাসে।-
‘তা কেন মরতে চাচ্ছেন? সন্তান ভাত দেয় না? তাড়িয়ে দিয়েছে?’ ‘সন্তান! হু হু হু। একটা সন্তান ছিল!’
-‘সে মরে গেছে?’
‘-আমাকে মেরে ফেলছে। কোরবানি দিয়েছে।’
‘আপনি তো দিব্যি বেঁচে আছেন। নিজেকে খুন করতে প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন।’-পুলিশ অফিসার সিগারেট ধরালেন।
ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে পুলিশ অফিসারের চোখে এক পলক তাকাই-
‘অনুস্বারের বিন্দুর মতোও ও আমাকে মূল্যায়ন করে না। তিন নাম্বার হাত ব্যবহার করে।’
-‘সেটা আবার কোন হাত?’পুলিশ অফিসার অবাক হলেন।
খানিক ভেবে বললাম-‘মানুষের তিন নাম্বার যে হাতটা আছে সেটা অজুহাত। এই হাতটা এই রকম হাত -না বলার জন্য যে একশ একটা কারণ খুঁজে পায় কিন্তু হ্যাঁ বলার জন্য একটা কারণও পায়
না এবং এই হাতটা সবচেয়ে বেশি সফলতা অর্জন করেছে হেসে হেসে বুকে ছুরি প্রবেশ করিয়ে দিতে অথবা কাছে টানার ছুঁতুতে দূরে তাড়িয়ে দিতে কিংবা দেওয়ার ছুঁতুতে না দেওয়ার শক্তিশালী পদ্ধতি স্থাপন করতে।’
‘চমৎকার বললেন তো’-দুজনে একসঙ্গে বলল।

‘এটা না হয় অজুহাত বুঝতে পারছি কিন্তু আপনি যে বললেন মূল্যায়ন করে না’-পুলিশ অফিসার এতটুকু বললে আমি বললাম-‘যে বৃক্ষের মাথা সবচেয়ে আনত, হাজার ঝক্কির মধ্যেও স্থির-পরিপার্শ্বের ভীতিজনক চাপে অবিচল-হাজার রকম গ্লানি গায়ে না মেখে হাসির মত অভিনয় করে ক্লান্ত হন না-তিনি বাবা। আমাদের আসমান যখন বিষণ্ণ হয়ে কান্না শুরু করেন, রক্তের ফোঁটা হয়ে ফ্রিজে রাখা বোতলের মত থতমতে হয়ে যায়-যখন সন্তান বড় বেশি বড় হয়ে যায়-ওই আসমানের চাইতেই বড়-বাবা তখন অনুস্বারের বিন্দুর মতই সূক্ষ্ম-মূল্যহীন; বিষয়টা ব্যাখ্যা করলে
এরকম দাঁড়ায়-ট্রেনের এক কোণে পিঁপড়া বা ঘরের কোণে মাকড়সার জাল -নিজের ইচ্ছে যেখানে অনুচিত; ঠিক তার কাছাকাছি উভয়ের সম্পর্ক স্থাপিত হতে থাকে। সেই আনত মাথা দিনে দিনে আনত হতেই থাকে আর আনত মাথার নিচে আশ্রিত হওয়া সে মাথা বড় বেশি বড় হতে থাকে। সেখানে পিতাকে হতে হয় বড় বেশি নত, অতি সামান্য, মূল্যহীন বিন্দুর মত আর ছায়ায় আশ্রিত হওয়া সন্তান হয় আসমানের চাইতেই বড় অতএব পিতা যদি সন্তানকে মান্য না করেন, বিরাট সমীহ
না করেন- গুঢ় বিপদ-অমাস্যায় আটলান্টিকের বিপুল ঝড়ের মত বিপদ পিতার জন্য অপেক্ষা করে। পিতা তাই বাধ্য হয়। সন্তানকে মান্য করেন উপাসক যেমন সকাল বেলায় সূর্যকে পবিত্র হয়ে
মান্য করেন। অতএব পিতার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না শূন্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অপেক্ষা ছাড়া। আমারও সে রকম অবস্থা।
‘তার মানে একটা বিষয় স্পষ্ট-আপনি সন্তানের অসৎ ব্যবহারে আত্মহত্যা করতে চাচ্ছেন’-পুলিশ অফিসার হাত দিয়ে মাথার টুপি ঠিক করলেন।

‘তা নয়। আমার এম্নিতেই ভালো লাগে না। অনেক দিন তো বাঁচলাম। আর কত?’
দুজন পুলিশ অফিসার বোবা দৃষ্টিতে আমার চোখে তাকিয়ে থাকল। পূণরায় বলতে শুরু করলাম-‘অনেক ভেবেচিন্তে আত্মত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং আমি আজকের দিনটি ঠিক করেছিলাম। আমি জানি আত্মহত্যা ভয়ংকর পাপ। পরকালীন জীবনে এর কোন ক্ষমা নাই। ওই জীবনের সবটা সময়ই জাহান্নামে থাকতে হবে। কিন্তু আমি উপায়হীন- অন্য আর একটি পথও নাই। তামাক পাতার মত জন্ম থেকে জ্বলতে জ্বলতে খুব হাঁপিয়ে ওঠেছি খুব করে ওর একটা শেষ দেখতে চাই, সে জন্যই এ পথ বেছে নেওয়া। মানুষের জীবনের এত এত সৎ ব্যবহার দেখতে দেখতে বেশ ক্লান্ত হয়ে গেছি, চোখ অন্ধ হয়ে আসছে ক্রমস, এর আগেই একটা ফায়সালা হওয়া চাই; এই জন্যই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সুকান্তের মত কবিতাও লিখেছি-তোমাদের রাজ্যে আমি পঙ্গুময়/জীবনের চাঁদ যেন থেঁতলানো পুঁটি। এই থেঁতলানো পুঁটিকে চিরদিনের মত শেষ করে দিতে চাই। জুন মাসের সাত তারিখকে নির্ধারণ করেছিলাম যে দিনে আমি আগমন করেছিলাম। কীভাবে নিজেকে শেষ করব এ নিয়ে বিস্তর ভেবেছি। গলায় দড়ি বা বিষ ব্যবহার বেশ সেকেলে। চলন্ত গাড়ী থেকে লাফ দিতে ভয় লাগে। ভয় লাগে এজন্য যে যদি বেঁচে যাই- কষ্টের শেষ থাকবে না-পঙ্গু হয়ে বাকী জীবন কাটাতে হবে। করোনাকে আমার বড় আহাম্মক লাগে।শালা আমার মত কয়লা মার্কা জীবন অলার কাছে আসে না। সে চিনে শুধু ধনবান আর ক্ষমতাবানদের। আমার মত অভাবী লোকের কাছে আসার তার টাইম নাই। মানুষের মত করোনাও আমাকে অবহেলা করে। শুধু যে করোনা আমাকে অবহেলা করে তা নয়-মৃত্যুও। সে রকম একটা ঘটনার খানিক উল্লেখ করতেছি। শুনবেন নাকি বিরক্ত বোধ করছেন?’
‘বলুন,বলুন’-মেঘময় আকাশ সূর্যকে ঢেকে ফেললে যেমন হয় তাদের মুখ এমনি মলিন। হয়ত তারা ভেবে নিয়েছে পাগলের পাল্লায় পড়েছে না শুনে নিস্তার নেই।

পূণরায় বলতে শুরু করলাম-‘আষাঢ় মাসের তের তারিখের সন্ধ্যাবেলা।সারাদিন বৃষ্টি। ঢলঢলে তুমুল বৃষ্টি। পাহাড়ি ঢলে চারপাশ জলে টই-টম্বুর। নিচু এলাকা থাকায় আশপাশ দ্রুত তলিয়ে যায়। এখানে বৃষ্টির মধ্যে যেমন ছাতার প্রয়োজন বর্ষায় তেমনি নৌকার। অথচ আমার কোনটাই ছিল না। আমি বাজারের একটা চা স্টলে বসেছিলাম। বৃষ্টির তাণ্ডব দেখছিলাম। ঠিক সে মুহূর্তে শাহেদ ছাতা মাথায় আমার সামনে এসে দাঁড়াল-
‘বিল্লাল কাকু বাড়িত যাইবা?’শাহেদ আমার প্রতিবেশী।সম্পর্কে ভাইস্তা হয়। দেখতে চলতে ভালো। দু বছর হয় বিয়ে করেছে। একটি সন্তানও হয়েছে ওর। আমি মুচকি হেসে বললাম-‘সে চিন্তাই করছিলাম, কি করে বাড়িতে যাব।’
শাহেদ চুন মাখানো পানের বোঁটা ফেলে সে দিকে এক পলক তাকিয়ে বললেন-‘লও ছাতি। আমি ভিইজ্জা যায়াম গা।’
বৃষ্টির জলে বোঁটায় লেগে থাকা চুন ততক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেল, সেদিকে তাকিয়ে বললাম-‘তুই ভিজবি কেন? ঠান্ডা লাগবে, না?’
শাহেদ হাসল-‘বৈঠা ধরে নাউ চালানি যায় না, কাকু; আর বৃষ্টিতে ভিইজ্জা অনেক অভ্যাস আছে। কিছু হইতো না। নেও ছাতি।’
ছাতা নিতে নিতে বললাম-‘একটু চা খেয়ে নে। সঙ্গে পানও।’
শাহেদ আপত্তি করল না। স্মিত হেসে মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে এক পাশে বসল।

আমরা যখন নৌকায় বসি সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। নৌকা বাঁধা ছিল বুড়ির ঘাটে। ঘাটেই বুড়ির ঘর। নাতিকে নিয়ে বুড়ি থাকে। বুড়িও সঙ্গে যাবে। শাহেদ বুড়িকে জানালেন-‘বৃষ্টি কমুক দাদি, তুমি কাইল যাইও।’
‘না, এহনি যায়াম।’-বুড়ি জোর দিয়ে বলল।
শাহেদ বলল-‘বাতাস বৃষ্টি আর ঠাডা পড়তাছে,যদি কিছু অয়া যায়।’
বুড়ি মানল না-‘তরা না নিলে পানিদে ভিইজ্জা যায়াম গা।’
শাহেদ অপারগ হয়ে সম্মতি দিল-‘ঠিকাছে, চলো। যে মেঘ আর বাতাস জানি না কি হয়া যায়, সাবধানে বইসো। বেশি নইড়ো না।’
বুড়ি পা বাড়াল। মৃদু পায়ে পিচ্ছিল পথে খানিক হেঁটে নৌকায় বসল। বুড়ি সঙ্গে নিল তার নাতিকে। তের কি পনের বছর বয়স হবে ওর। নৌকা ছাড়া হল।ডিঙি নৌকা। মৃদু ঢেউ বাতাস আর বৃষ্টির
চাপে নৌকা এদিক ওদিক কাত হতে থাকে। শাহেদ পিছনে দাঁড়িয়ে লগি ঠেলতে শুরু করে। পনের বছরের ছেলেটি সামনে বসে ছোট বৈঠা চালনা করছিল আমি এবং বুড়ি ছাতা মাথায় পাশাপাশি বসে ছিলাম। দুলতে দুলতে নৌকা এগুতে থাকে। বৃষ্টি বাতাসের তাণ্ডবের মধ্যেও আমি বুড়িকে দেখি। কি সুন্দর। ভাসা ভাসা চোখ। কোঁচকানো ভ্রু। মুখের দু পাশে কী দারুণ মায়া মায়া ভাব। সুগঠিত কপালে বৃষ্টির দু তিন ফোঁটা-অসাধারণ মাধুর্য প্রকাশিত করেছে। আমার চোখ শান্ত হয়ে যায় । হৃদয়জুড়িয়ে যায়। পৃথিবীতে সবাই ওকে বুড়ি বললেও আমি ব লতে পারব না। সে চির যৌবনা। ফুলেল গোলাপ গাছের মত স্নিগ্ধ। বেশ সময় ওর দিকে তাকিয়ে বলি-‘কেমন আছো, আসমা?’
আসমা আমার চোখে এক পলক তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে-
‘জানি না। সে হিসেব আর রাখি না।’


সে সময়ে নেীকা বেশী দুলতে থাকে। একবার বলি যে-‘শাহেদ , ওই বাড়িতে একটু বসি, বৃষ্টি কমলে যাই।’
শাহেদ মানল না- ‘টিকমাইরা (চুপ করে) বয়া থাক। যায়াম গা।’ শাহেদ দ্রুত লগি ঠেলতে থাকে। বৃষ্টি বাড়ে, হাওয়া বাড়ে, বিদ্যুৎ চমকায়, বজ্রপাত হয়; শব্দ করে পড়ি -লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমীন। একবার বুড়ির দিকে তাকাই আরেক বার শাহেদের দিকে। বুড়ি এক হাতে নৌকার পাটাতন ধরে অন্যহাতে ছাতা ধরে বসে থাকে। বাতাস ওর পিঠের কাপড় সরিয়ে দেয়। বড় সুশ্রী, কোমল সে পিঠ -একটি বার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়। হঠাৎ ভয়ংকর শব্দে বজ্রপাত হয়। আমার শরীরের এক পাশে আগুনের উগ্র তাপ ছুঁয়ে যায়। পরক্ষণেই আমি তাকাতে পারি না। যেন দীর্ঘ বছর পর তাকালাম। কী যে দেখলাম এক পলক তাকিয়ে বুঝতে পারলাম না। আবার তাকালাম-মনে হয় এক লক্ষবার তাকালাম-একই দৃশ্য এক লক্ষবার দেখলাম।কী দেখলাম?এটা অবিশ্বাস্য-বোকাও বিশ্বাস করবে না। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য ও দুঃখ জনক ব্যাপার এই যে আমি বেঁচে আছি।প্রথমে নৌকা কাৎ হয়। ধীরে ধীরে এক পাশে জল উঠতে থাকে।অল্পক্ষণেই আবিস্কার করি বুড়ি লাফ দিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে বুড়ির নাতনিও। নৌকার পিছনে তাকাই,শাহেদও অদৃশ্য। ততক্ষণে নৌকার অপর পাশে বসে, কলা গাছের খোল দিয়ে দ্রত জল ফেলি।এক পাশে জল নৌকায় আশ্রয় নেয় অন্যপাশে জল ফেলি। যেন দাঁড়িয়ে আছি দৃশ্যময় এক হাওয়ার উপর-যেখানে খুব সতর্কতায় দাঁড়াতে হয়-একটু নড়লে তলিয়ে যেতে হবে গভীর হাওয়ার জগতে।যেখান থেকে আর কখনো ফেরা যায় না।আপ্রাণ চেষ্টা করে নৌকাকে সামান্য জলমুক্ত করতে পারি। দ্রত শ্বাস ফেলি।একদিকে বৃষ্টির জল, হাওয়া ও বিলের জল আমার শরীরে সামান্য শীত না লাগিয়ে উষ্ণ বরফের খণ্ড প্রবেশ করিয়ে দেয়-মনে হয় আগুনের সমুদ্রের উপর বসে আছি-আমার চারপাশে ধোঁয়া উড়ছে।হয়ত এজন্যই নিজের চিন্তায় বিহ্বল।বুড়ির কথা মনে নাই, বুড়ির নাতনির কথা এমুনকি শাহেদের কথাও। শাহেদ আমাকে ছাতা দিয়ে নিজে ভিজে ছিল একথাও ভুলে গেছি- আশ্চর্য স্বার্থপর আমি।আর আমারই বা দোষ কী?মানুষ মাত্রই তো স্বার্থপর।যার জন্য জীবন বিলিয়ে দেওয়া হয় সেই তো ছুরি বসিয়ে দেয় বুকের গোপন ঘরে। এমুনতো মানুষ থাকে -শিখর কেটে গোড়ায় পানি ঢেলে হাসে-আর আমার তো এটা জীবন মরণ যুদ্ধ। হঠাৎ প্রকাশিত হয় বুড়ির শাড়ীর আচল -নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকাই-নৌকার খুব কাছে ভীড় করে। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের সঙ্গে একবার উপরে উঠে অন্যবার নিচে নামে।

আকাশ ভেঙে সেই যে বৃষ্টি-পাহাড় ভেঙে সেই যে হাওয়া- বিদ্যুৎ ক্ষয়ে সেই যে বিজলী-আওয়াজের আসমান ভেঙে সেই যে বজ্রপাত- থামছে না। আমি থরথরে কাঁপছি। বৃষ্টির জলে শরীর ভিজে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু ঘামের জলে আমার ভিতরটা সমুদ্র হয়ে গেছে।হাত বাড়িয়ে শাড়ী ধরি।ধীরে ধীরে টান দিই।ঝাঁকি জালের মত।এত লম্বা শাড়ী হয়, হাজার বছরের পথের সমান-ভয়ে ভয়ে নিজেকে বলি। না শাড়ী শেষ হতে চাচ্ছে না। যেন যুগের পর যুগ ধরে শাড়ী টানছি-শেষ হচ্ছে না।একটা সময়-মনে হয় দীর্ঘ বছর পর -এর তল পাই-শাড়ী আসে ঘুড়িহীন সুতোর মতন। স্বযত্নে সে শাড়ী বুকের সঙ্গে চেপে ধরি-জানি না সেটা কেন-হয়তবা অকারণে কিংবা নিজেকে সামান্য সান্ত¦না দিতে বা বুড়ির শেষ চিহ্নটুকু পেয়েছি -এজন্য। শাড়ীটি আমার সামনে রেখে বৈঠা ধরি। নৌকা কোন দিকে যায় ঠিক বুঝি না আমি-চেষ্টা করি আমার বাড়ির দিক ঠিক রাখতে।ঝড়ো হাওয়া- বৃষ্টি -বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতের মধ্যে ক্ষুধিত বাঘের তাড়া খাওয়া হরিণের মত দিগি¦দিক হয়ে যাই। নিজেকে মানাতে চেষ্টা করি-আমার অপরাধ শূন্য-বেঁচে আছি নিশ্চয় এটুকু অপরাধ না। একটা সময় বুঝতে পারি-নৌকা সঠিকভাবে এগুচ্ছে। বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি। বুড়ির শাড়ীটা স্বযত্নে বুকের সঙ্গে চেপে ঘাটে নৌকা ভিড়াই। পায়ের সঙ্গে নৌকার মাথা লাগিয়ে ধাক্কা দিই । নৌকা ভেসে যায়-দূরে-হাওয়ার ইচ্ছামত।ভেজা কাপড় নিয়ে ঘরে আসি। কাপড় পাল্টাই। ঘরের ভিতরে একটু গর্ত করে বুড়ির শাড়ীকে শেষ আশ্রয় দিয়ে মাটি চাপা দেই। এটা আমার কাছে গোপন কবর হয়ে থাকে।

এইজন্যই বলি মৃত্যু আমাকে অবহেলা করে। যেখানে তিনটি মানুষ মারা গেল সেখানে আমি বেঁচেই থাকলাম। এক ছোট ভায়ের কথা মনে পড়ে। সবাইকে জানিয়ে এক বিকেলে যে জিপি টাওয়ারের উপর থেকে লাফ দিয়েছিল; সেদিন বিকেলের সূর্য এক খণ্ড মেঘের ফাঁকে লুকিয়ে বেদনা প্রকাশ করছিল এবং ওইদিন মানুষেরা সাক্ষী দিয়েছিল ছ্যারাডা ম্যালাদিন পরে নিজের হন্ন (স্বপ্ন)পূরণ করছে। আমার অবশ্য এটা স্বপ্ন না। নিজেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য আমার কাছে যথেষ্ট কারণ নাই। সংক্ষিপ্ত করে বললে শোভন হয় -আমার বেঁচে থাকতে অস্বস্তি লাগে। এই রকম অস্বস্তি পৃথিবীতে কোটি মানুষের হয় -সেজন্য ওরা আত্মহতা করে না কিন্তু আমি করব -বড় অসহিষ্ণু বলে।পৃথিবীতে বাস্তব সত্য তো এই যে-নদী পাড় হয়ে গেলে মানুষ পিছনে ফিরে দেখে না,নদী কে পাড় করে দিল; আমি অবশ্যি কারো আশা করেছি বিষয় এই রকম না; আমার আত্মত্যার কারণ সল্প: প্রথমত:- আমি বেশ বেশি অসুস্থ। ওষুধ ফেল করছে বারেবার।বৃদ্ধ মানুষের কাছে ওষুধ এম্নিতেও পরাজিত হয়। বয়সম তো আর কম হল না, নব্বই বছর তিন মাস দু সপ্তাহ দুদিন তিন ঘণ্টা ছ মিনিট কুড়ি সেকেন্ড।’ পুলিশ অফিসার মিনিট কুড়ি সেকেন্ড আমাকে দেখে বললেন-
‘তিনটি বিষয় ক্লিয়ার না। প্রথমতো শাড়ী ঘরে নিয়ে এসে কবর দেওয়া, দ্বিতীয়ত-নৌকা ভাসিয়ে দেওয়া, তৃতীয়ত-বুড়ির প্রতি মুগ্ধ হওয়া।’


বললাম-‘কিশোর বয়স থেকে ওকে আমি পছন্দ করতাম। ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত একি সঙ্গে পড়ার দরুন ওকে বেশি দেখার সুযোগ হয়েছে।আমরা বেশ ভালো বন্ধু ছিলাম।এক সঙ্গে অনেক ঘুরেছি,অনেক দেখেছি।ওর গলা খুব সুন্দর ছিল।গান শুনে মুগ্ধ হতাম আমি।দুজনে এক সঙ্গে মেট্রিক ফেল করার পর ওর বিয়ে হয়ে যায় আর আমি হই বাড়ি ছাড়া।দিনে দিনে ও বেশ সংসারী হয়। আমি বাড়ি ফেরার পর ওর সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়, আলাপ হয়। ও যখন তিন সন্তানের মা হয়ে স্বামী হারা হয় তখন একটু বেশীই দুঃখিত হই।মনের মধ্যে ওর জন্য পুরানো সেই আকর্ষণ
আরোও বৃহৎ হয়। যদিও তখন বউ আর সন্তান নিয়ে ভালোই ছিলাম। পর্যায়ক্রমে আমি যখন স্ত্রী হারা হলাম-ছেলেকে লেখাপড়া করিয়ে বড় অফিসার বানালাম-আমি খুব একা হয়ে গেলাম। মূলত সেজন্যই ওর প্রতি আমার আকর্ষণ আর ওর শেষ চিহ্নটুকু কবরস্থ করি এজন্য যে-ও আমার পাশে বসেই শেষ বিদায় নিল-সেজন্য কিছু করা উচিত ছিল আর সেটা শাড়ী কবরস্থ করার মাধ্যমে নিষ্পন্ন করলাম।নেীকা ভাসিয়ে দিয়েছি মূলত নিন্দার ভয়ে,অপরাধ না করওে অপরাধী হব এজন্য।’ পুলিশ অফিসার ঠোঁট উল্টিয়ে হাসলেন-‘আমার তো মনে হয় এর উল্টো ঘটনা।’-‘কী রকম? অন্য অফিসার জিজ্ঞেস করলেন।


মাথার ক্যাপ খুলে চুলে হাত চালিয়ে পুলিশ অফিসার বললেন- ‘নেীকায় থাকা সময়ে বুড়োর পুরনো প্রেম জেগে ওঠেছিল। দু হাতে জাপটে ধরেছিল বুড়িকে। বুড়ি কাঁচুমাচু হয়ে বাঁচার
চেষ্টা করছিল। তাদের ঝাঁকুনিতে শাহেদ পড়ে যায়। বুড়ো তখন বুড়ির নাতনিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। যেহেতু তখন বৃষ্টি ছিল। ওখানে প্রবল স্রোতও ছিল। ওরা দ্রুতই তলিয়ে যায়। বুড়ো সে
সময় প্রথম ও শেষবারের মত গোপন প্রেমে আপ্লুত হয়। সেই কিশোর সময়ের প্রেমিকা আসমা। দীর্ঘ বছর পরের এই সুযোগ তো সহজে ছেড়ে দেওয়া যায় না। কাজ শেষ হলে যখন দেখে বুড়ির প্রাণ নাই;তখন বুড়িকে ফেলে দিতে গিয়ে দেখে শাড়ীর সঙ্গে হাত আটকে আছে সেজন্য শাড়ী রেখে দেয়। শেষ সময়ে নেীকা ভাসিয়ে দেওয়ার কারণ তো এই যে,বুড়ো নেীকা
করে এসেছিল-এই ব্যাপারটি চিরদিনের মত গোপন করে রাখতে।তাই না,বিল্লাল চাচা?’
দীর্ঘ সময় আমি কথা বলতে পারলাম না।এক অন্যরকম বোবা হয়ে গেছি।মানুষ কিছু না দেখেই যে নির্ভুল হিসেব করতে জানে এর আগে জানতাম না।


পুলিশ অফিসার আবারো বললেন-‘ঠিক বলেছি,বিল্লাল চাচা?’ আমি এক পলক ওঁর দিতে তাকিয়ে চিৎকার করে বললাম-আমি আত্মহত্যা করব। আমাকে যেতে দিন। যেতে দিন। পুলিশ অফিসার কিছু বললেন না। নিষ্পলক আমাকে দেখতে থাকলেন।

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com