বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন

মানুষ খেকো মানুষ: ড. শাহনাজ পারভীন

মানুষ খেকো মানুষ: ড. শাহনাজ পারভীন

মানুষ খেকো মানুষ গল্প মজার গল্প ড. শাহনাজ পারভীন Golpo Story

অচেনা নম্বরের ফোনটা পাবার পর থেকেই কি এক উদ্বিগ্ন রোমাঞ্চিত সময় কাটছে তাজুলের। রাত যেন ফুরাতেই চায় না। আহা আজকের রাত এত দীর্ঘ কেন? দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর রাত পার করতে তাজুলকে বেশ কয়েক বার বিছানা থেকে নামতে হলো। খুব সর্ন্তপনে। শব্দ এড়িয়ে। কিন্তু যতই শব্দ এড়াতে চাক না কেন ক্যাচর ক্যাচর শব্দ যেন এর মজ্জাগত। খাটটি নতুন নয়। আবার বেশ পুরনোও নয়। জেসমিনের এই বাড়িতে আসবার বয়সী। খাটটির স্বভাবও হয়েছে জেসমিনের মত।
খুুব অল্পতেই বিরক্তিকর ক্যাচর ক্যাচর শব্দ করে। কতদিন অবশ্য জেসমিন খাটটিকে পাল্টাতে বলেছে। খাটটি পাল্টাবো পাল্টাবো করেও এ অজুহাত এ অজুহাতে পাল্টানো হয় নি। ইদানিং খাটটি পাল্টাবার কথা উঠতেই কেন যেন তাজুলের ওর বয়সী আরো কিছু পাল্টাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না কারো। বুকে বুুকে ঘর্ষণে ঘর্ষণে আগুন জ্বলে সেখানে।
কিন্তু মুখ খুলতে পারে না। একদিন অবশ্য মুখ ফস্কে বলেই ফেলেছিল যদি খাট পাল্টাবার মত নতুন করে পাল্টে ফেলা সহজ হতো সবকিছু। তাহলে আর উটকো কচকচানি থাকতো না। অন্য কিছু পাল্টাতে গেলে কেন যে এত ঝক্কি ঝামেলা? মুহূর্তেই জেসমিন বুঝে ফেলেছিল-
কি স্পর্ধা?
পুরনো খাটের মত আমাকে পাল্টাতে চাও? আমি ক্যাচর ক্যাচর করি?
তাজুল ভাব বুঝে ঘর থেকে পালিয়ে পার পেয়েছিল। ও ঘরে টিচার মেয়েকে পড়াচ্ছে। নিজের কলিগ। মান সম্মান বুঝি যায়?
পালাতে পালাতে নিজের চুল নিজে ছেড়ে তাজুল। এ ব্যাপারে জেসমিনকে আজ তাকে স্যালুট করতে ইচ্ছা করে। ও বার বার নিষেধ করেছিল। নিজের কলিগকে প্রতিদিন বাড়িতে আসবার সুযোগ করে দিও না। খাল কেটে কুমির এনো না। কিন্তু জেসমিনকে রাকিবের টিচার হিসাবে সুখ্যাতির কথা শুনিয়েছে। ওর ছাত্র ছাত্রীরা সকলেই অনেক ভাল রেজাল্ট করে।
আফটার অল মেডিকেল ইজ্ঞিনিয়র যে যে ডিফামেন্টে ভর্তি হতে চায় সে তাদের সাফল্য গাঁথা শোনায়। জেসমিনের পাল্টা জবাব তুমি আসলে কম টাকায় মেয়েকে পড়াতে চাও। কিন্তু এটা মনে রাখবে তুমি যেভাবে তাকে পেমেন্ট করবে, সেও সেভাবেই …
ও আর কথা বাড়াতে পারে নি। সঙ্গে সঙ্গে তাজুল রিয়াক্ট করেছে।
কি বললে তুমি? বলো, বলো, এগেইন টেল মি…
বললাম রিসিভ এন্ড সেন্ড। যে মাত্রায় সে রিসিভ করবে সেই মাত্রায়ই সে সেন্ড করবে। ব্যস…আর কিছু বলতে চাই না। জেসমিন সে যাত্রায় চুপ করেছিল।

তুমি মানুষকে বিশ্বাস করো না কেন? মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ।
বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা নয় তাজুল। এখানে মান সম্মানের প্রশ্ন।
সেটাই তো বলছি। আমি ওকে কথা দিয়েছি। অন্য কলিগদের বাচ্চাদেরও পড়াচ্ছে। এমনকি অধ্যক্ষ স্যারের মেয়েকেও সে পড়ায়। তাছাড়া তিন কলিগের ছেলে মেয়েকে ও পড়িয়েছে। তারা এখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র। তুমি অতো কিছু ভেবো না তো।
জেসমিন আর কথা বাড়ায় নি। মেনে নিয়েছে।
তাজুলের কলিগ হিসেবে রাকিবকে আলাদা একটু যত্ন আত্তিরও করে। চা নাস্তা ফ্রিজের ঠান্ডা পানি একটু হেসে কথা বলা।
কখনোই ও ওর পরিমিতি বোধের দেয়াল টপকায় নি। কিন্তু ইদানিং ওর ব্যবহারে বাড়াবাড়ি কিছরু ইঙ্গিত পাচ্ছে তাজুল।
প্রতিদিনই নাস্তায় ট্রেন্ড আনা, সাজেও চমৎকারীত্ব। হালকা লিপস্টিক, সুগন্ধি পারফিউম। তাজুলের লাটাইয়ের ঘুড়িতে একটু একটু পাল দেওয়া সব মিলিয়ে তাজুল কিছু একটা আঁচ করতে চায়। কিন্তু জেসমিন চালাক, যাকে বলে ফক্জি। শিয়ালের ধূর্ততা। ওকে বাগে আনা অত সহজ নয়।
আবার তাজুল ভাবে এমনটি সন্দেহ করা ঠিক নাও হতে পারে। জেসমিন আর তাজুল সেম এজ। এক ইয়ারে ওরা ম্যাট্রিক। সে ক্ষেত্রে তাজুলকে যতটা ইয়াং লাগে জেসমিনকে তেমনটি মনে হয় না। ওকে ওর মুল বয়সের চেয়ে আরো বছর দশেক বড় লাগে। আর তাজুলকে লাগে বছর দশেক ছোট। গড়ে বিশ বছর! সেজন্যই ওরা বহুদিন একসঙ্গে কাপল ছবির জন্য পোজ দেয় না। সেই যে ফেসবুক প্রথম যখন খুলেছিল, আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে তখনকার সেই ছবিটাই ওর কাভার ফটো। এই
বিষয়টা ম্যানেজ করতে যেয়ে তাজুলও তার বছর দশেক আগের প্রোফাইল পিকচারটা আর চেঞ্জ করে না। জেসমিনেরও এ নিয়ে কোন মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ঔ বিষয়টা এড়িয়ে যায় কাউকে না বুঝতে দিয়েই।

জেসমিন শিক্ষিত। চাকুরিজীবি। ও চাকুরি করে সরকারি প্রাইমারিতে। সকাল ন’টা চারটা স্কুল। অনেক ঝক্কি ঝামেলা।
ট্রেনিং, ক্যাম্পেইন, র‌্যালি, মিছিল, সংসার, সব… বাচ্চা সব মিলিয়ে ওর বিনোদন বলতে রাকিবকেই বেছে নিয়েছে বলে তাজুলের মনে হয়। তাজুলও ওকে ঘাটাতে চায় না। ও ওর পৃথিবী নিয়ে থাকুক। কি আর করবে? চাকুরিজীবি মেয়েদের একটা এক্সটা সম্মান বোধ আছে। শেষ পর্যন্ত তারা ফিরে আসতে পারে।
ও খুব কাছ থেকে দেখেছে রাজনের ওয়াইফকে। সেও প্রাইমারি স্কুলের টিচার। ভেগে যাচ্ছিল সামান্য একটা বাসের সুপারভাইজারের সাথে। অথচ রাজন একটা সরকারি কলেজের টিচার! প্রতিদিন একই টাইমে একই বাসে দীর্ঘ যাতায়াত করতে করতে সুন্দর সুপারভাইজারের সাথে খেই হারিয়ে ফেলে রাজন ভাবী। ভুলে যায় তার নিজের স্ট্যাটাস, ভুলে যায় তার ফ্যামিলিকে। অতঃপর শেষ মুহূর্তে রাজন যখন বিষয়টা বুঝতে পারে তখন গঙ্গার জল যমুনায়! তারপরও গাড়ির মালিককে বলে সুপারভাইজারকে ছাড়িয়ে ওর শেষ দফা হয়। অবশ্য গাড়ির মালিক ছিল রাজনের ছোট বেলার বন্ধুর বড় ভাই। রাজন
একাকি আড়ালে বড় ভাইয়ের পা চেপে ধরে তার বিপদের কথা বলে তার সাহায্যের একান্ত প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিল।

প্রতিপত্তিওয়ালা বড়ভাই তার চাকরি ছাড়িয়ে শহর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল শাসন করে। রাজন এখন দিব্যি সুখি সুখি ভাব করে প্রতিদিন নিত্য নতুন কাপল পোস্ট দেয়। অথচ ভেতরের খবর ক’জনে জানে? তাজুল ভাবে আর হাসে। বুকের মধ্যে ঝড়
ওঠে। আহা!
এ পাশ ওপাশ করে। ঘুম আসে না। রাত কাটে না। আজকের রাত এত বড় বেশি বড় কেন? কখন সকাল হবে? এ পাশ ও পাশ করো কেন? কি সমস্যা? হ্যাভ এনি প্রবলেম? জেসমিন ঘুম ঘুম চোখে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করে।
নো, নট এনি… তাজুল পাশ ফিরে শোয়।
জেসমিন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবারও নাক ডাকে। নাক ডেকে ঘুমায়। আজকের নাক ডাকাটা ওর কাছে অন্যদিনের চেয়ে ডিফরেন্ট মনে হয়। ওর মনে হয় এই মুহূর্তে পিলোটা বগলে করে ড্র্ইংয়ের ডিভানে গিয়ে বাকি রাতটা এনজয় করুক।
এনজয় শব্দটা ওর মাথায় আসতেই মাথার মধ্যে অচেনা নম্বর থেকে আসা ফোনটা অটো রিলে হয়। অন্য রকম শিহরণে ও কাঁপতে থাকে।
কাল দেখা হচ্ছে, স্যার। আমি ফোর্থ ইয়ার, ফিলোসোফী।
রাত পোহালেই… ফোর্থ ইয়ার, ফিলোসোফি…
ফোর্থ ইয়ার, ফিলোসোফি। স্যার, চিনতে পারছেন। লাবণ্য স্যার। স্যার মনে পড়ছে? ঐ যে দশ মিনিট সময় চাইছিলেন।
আগামী কাল আমার সময় আছে। বেলা বারটার পরে। হোষ্টেলের ইনচার্জ বড় আপু কাল দেশে যাবে। হোষ্টেল তখন কিছুটা ফাঁকা থাকবে। আমি বের হতে পারবো। স্যার, কাল কি আপনার সময় হবে?
হু হা।
স্যার, হু হা করতেছেন ক্যান? সময় হবে?
না, না ঠিক আছে। আগামীকাল তো ফ্রাইডে। ফুল টাইম ইজ ফ্রী টাইম। ইট্স ওকে। আই কল ইউ লেটার।
থ্যাংক্স, স্যার।
ইট্স ওকে।
কিন্তু কেন যেন তাজুলের ভয় লাগে। আবার ভাবে, কি করে ভয়কে জয় করতে হয় তা তাজুল জানে। কিন্Íু সেই যে ছোট খাটো ধরাটা খাওয়ার পর। কি আশ্চর্য! কত বড় সাহস মেয়েটার? একেবারে সরাসরি প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে নালিশ! কিন্তু ন্যাড়া কি আর বেল তলায় সব সময় যায়? আর বেলও কি গাছে গাছে পেকে বসে আছে? ন্যাড়া কখন যাবে তার তলায়? এই বিষয়টা রাকিবই ম্যানেজ করে দিয়েছে। ও এ ব্যাপারে এক্সপার্ট। ছাত্রজীবন থেকেই। ও সায়েন্স এ পড়ত, পড়ার চাপ ছিল।

সেই ক্ষেত্রে আর্টস বা কমার্সে পড়ার চাপ অতোটা ছিল না। ওরা অন্য দিকে আড্ডা মেরে বেড়াত আর রাকিব মাথা গুজে সারাদিন পড়তো। সেই সুবাদে অকারণ আড্ডা ওর কোনকালে ছিল না। এখনো। কলেজের ঘন্টার সাথে সাথে ঘড়ি ধরে ক্লাসে ঢোকা, সারাদিন কোচিং, হ্উাজ টিউটর। ফুল টাইম বেস্ট টিচার। সায়েন্সের রেজাল্ট ও যোগ দেবার পর আকাশ চুম্বি। স্যার ওকে অন্য রকম সমীহ করে। ভালবাসে। কলেজের স্বার্থেই। স্যারকে রাকিব বলেই বিষয়টা মেইনটেন করেছিল। তদন্ত কমিটি
গঠন করতে দেয় নি। সে যাত্রায় বেঁচে গেছে। কিন্তু ঘটনা তো সব সময় সমান ঘটে না।
আবার মাথার মধ্যে খেলা করে- নো রিস্ক নো গেইন।
লাবণ্য! ও মাথা ঠিক রাখতে পারে না। সেই তেজি মেয়েটা। চটাং চটাং কথা। আগুনের ফুলকি যেন। ভাঁপ ওঠা। খাড়া নাক, উন্নত চিবুক, পাঁচ ফিট তিন ইঞ্চি লম্বা, ঝাকড়া বাবড়ি চুল। চোখের কোণায় দুষ্টুমি, না আগুন? না, এই মেয়েকে নিয়ে হোটেল বুকিং দেয়া যাবে না। আগুনের ফুলকি। শহর চষে বেড়ায় হয়ত। অথচ এই মেয়েই যখন ফাষ্ট ইয়ারে, গ্রাম থেকে এলো। কি ড্যাবড্যাবে চাহনি, নিতম্ব ঢেকে যাওয়া মাথাভর্তি চুল। রাজভোগের ভেতরের কালার ছিল।
আর এখন একেবারে পাক্কা ছানার রসগোল্লা। ধবধবে ফরসা। কি করে হয় এ রকম? তাজুলের মাথায় ঢোকে না। ও দেখেছে গ্রামের মেয়েগুলো শহরে আসতেই পুরো শহর গিলে খেতে চায় যেন!
লাবণ্য! আহা কতদিন শালি ত্ইু আমার রাতের ঘুম হারাম করছিস। ওর জন্য চাই নিরিবিলি। শহর থেকে দূরে। হোল ডে, নট অনলি টেন মিনিটস। বাসা বাড়ি। ঘড়ার জল নয়, ও তো একেবারে ছলাৎ ছলাৎ নদী। সেই ক্ষেত্রে হোটেলের কোলাহলময় ছোট্ট রুম ওকে নিয়ে পোষাবে না। ওর জন্য চাই প্রশস্ত বাথ, ফ্রিজের ঠান্ডা। ছোট খাটো একটা লিভিং রুম। সারাদিন। সন্ধ্যার আগে হোস্টেলে পৌছে দিলেই হবে। আকাশ পাতাল চিন্তায় ওর আর বাকি রাতটা ঘুম হয় না। কিন্তু কোথায় পাবে নিরিবিলি
বাড়ি। জেসমিনের ছুটি। কিন্তু এই পুরনো ক্যাচরওয়ালি মহিলা তো ওকে ছাড়া ছুটির দিন বাড়ি থেকে নড়বে না। এই শহরেই তার বাপের বাড়ি। একটা রাতও তো বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে কাটায় না। উহ অসহ্য। কিছু বললেই ওর চটাং চটাং যুক্তিবাদী কথা- একটা দিন দুজনার ছুটি। ইটস আওয়ার ফ্যামিলি ডে। নট অনলি ওন ডে। ওকে। এই একটা দিন কোনো ছাড় নেই ।


তাজুল ভাবে, না অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। ওর রাগিবের কথা মনে পড়ে যায়। না, এত রাতে এখন ফোন দেওয়া ঠিক হবে না। সকালে কথা বলতে হবে। নিশ্চয়ই ও একটা ব্যবস্থা করে দেবে। ও এ ব্যাপারে এক্সপার্ট। তারপর লাবণ্যকে জানালেই হবে।
পরীক্ষা আছে আজ। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউটর ও। যেহেতু পরীক্ষা চলছে, ক্লাস সাসপেন্ড। কিন্তু ছুটির দিন। ক্লাসের কথা বলেই ও অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি পরিপাটি হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। এবং যথানিয়মে কলেজ ক্যাম্পাস। অপেক্ষা। এবং অপেক্ষা। তার আগে ঠিক করে রেখেছে বাল্য বন্ধু রাগিবের বাসায় সবকিছু। রাগিবের ফ্যামিলি বাসায় নেই। সেই সুুবাদে সাাজানো বাসা। কোন সমস্যা ন্ইে। ওর চাওয়ার মত সবকিছু। যথাসময়ে সেই কাক্সিক্ষত সময় এলো। রাগিব আছে বাসায়। পাহারায়। কোন ভয়ের কিছু নেই। সময় যেন পালক ছোঁয়ানো ঘোড়া। সে দৌঁড়ায় না। সে ওড়ে। উড়ে উড়ে চলে। কিন্তু সেই অবিশ্রান্ত আকাক্সিক্ষত মুহূর্তেই বেজে চলেছে ঘরের কড়া ঝনাৎ ঝনাৎ। আকাশ কাঁপিয়ে যেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। দুড়ুম বাজ পড়ল কোথাও। অথবা ভ’মিকম্পে দুলে উঠলো পুরো পৃথিবী। ঝনাত ভেঙে পড়লো সবকিছু। আকাশ কাঁপানো কড়া নাড়ার শব্দে মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিল নতুন কেনা দামি জিন্স। যদিও আজ একটু বেশিই সময় নিয়েছিল ও। শালীকে বাগে আনা যাচ্ছিল না কিছুতেই। যেন ফনা তোলা গোখরো…আহ…
দ্রুত পা গলিয়ে রাজ্যের বিরক্তিতে দরজার নব ঘুরাত্ইে ওর সামনে আকাশ ভেঙে পড়লো। দরজাটা একটু ফাকা হত্ইে দুু’হাত দিয়ে ঝপাৎ সরিয়ে দিয়ে দুমদাম ঢুকে পড়লো পুলিশের এক দঙ্গল স্পেশাল ফোর্স। কিলবিল করছে তারা ফ্লাট জুড়ে।
কিছু বুঝে ্উঠবার আগ্ইে হাতকড়া পড়লো হাতে। পুলিশ অফিসারের মুখ থেকে যেন দোযখের অগ্নি উদগিরিত হচ্ছে অহর্নিশ। বাকরুদ্ধ অবস্থায় রাগিবকে খুজে পাওয়া গেল ড্র্ইংরুমে। হাতকড়া অবস্থায়। ঔ ধরা পড়েছে আগে। সারা বাড়ি পুলিশের কড়া নজরদারিতে।
স্যার চুপ শালা। প্রতিদিন নতুন নতুন মাল নিয়ে…
স্যার আবার?
স্যার এবারের মত আমাকে ছেড়ে দেন। আমি আর জীবনেও করব না এ কাজ। মাল ফেল মাল..
পাশ থেকে স্পেশাল ফোর্সের একজন বলে উঠলো।
ও যেন অকুলে কুল ফিরে পেলো। যাক বাঁচার একটা পথ খুলে গেল।
স্যার আবার
ঝটপট মাল ফেল। পিছনে তাকিয়ে দেখে আলুথালু মেয়েটির প্লাজোটা কার হাতে…
স্যার, কাছে তো কিছু ন্ইা হাজার দুয়েক হবে।
কেন, এই কাজ করবি রোজ রোজ আর ব্যাংক ব্যালান্স সাথে নিয়ে ঘুরবি না। তা কি হয়? মাল ফেল। হাজারে কোন কাজ
হবে না । লাখ লাখ মালের ব্যবস্থা কর এখনি। নইলে চল থানায়।
এই তিনটাকেই একসাথে গাড়িতে ওঠা ।

শালা নচ্ছামি। নচ্ছামির জায়গা পাও না। আজ এ জায়গা তো কাল ঐ জায়গা। এইবার দেখ। তাজুলের পুরো মাথা ফাঁকা হয়ে
যায়। ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে জুয়েলার্স এর সাদমান সাকিব এর বিমর্ষ চেহারা। লোহার কাঠগড়ায় দাড়িয়ে কান্নায়
ভেঙে পড়ার দৃশ্য। গতকালই দেখেছে টিভিতে। এই কয়দিন পড়ছে খবরের কাগজের পাতায় পাতায়। ফেসবুকের স্ট্যাটাসে।
জুয়েলার্স এর টাকা আর প্রতিপত্তির কাছে ও তো নস্যি!
ওরা তো ব্যবসায়ী। চাকরী যাবার কোন ভয় নেই। কিন্তু কোর্টে কেস হলে ওর সাজা হলে প্রথমেই তা ওর চাকরিটা যাবে।
মান সম্মান ধুলিসাৎ হয়ে যাবে। ওর তো মেয়েদের মত ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
ওর মাথায় আবারো ভেঙে পরা আকাশ মুহূর্তে জোড়া লেগে আবার ভেঙে পড়ে। দোযখের আযাবের মত। একবার পোড়ানো
গলানো দেহ মুহূর্তেই নতুন হয়ে আবারো নতুন করে শাস্তি শুরু। এইভাবে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত পুড়তেই থাকা। পুড়ে খাক
করে দাও। আবার জোড়া লাগাও। শাস্তি দাও। পোড়াও। নতুন রূপে গড়ে তোলো। আহ কি যন্ত্রণা! ছোট বেলায় মসজিদের
হুজুরের বয়ানে শুনেছিল ও ।
মনে পড়ে কদিন আগে পড়া একটি গল্পের কথা মানুষ খেঁকো গাছ। মোহনীয় একটি গাছ রাস্তা থেকে তুলে এনে যে লাগিয়েছিল
তার বাগানের এক কোণায়। বেশ কিছুদিনের মধ্যেই সে যখন টের পায় গাছটি হাঁস, মুরগী, বেজি, কুকুর এবং সর্বোপরি
মানুষ খেঁকো। তখন তার পরিবারের শত অনুরোধেও গাছটি কাটা থেকে বিরত থাকে সে। মনে মনে ভাবে, টাকাওয়ালা
মানুষ তো টাকা দিয়ে বাঘ, ভাল্লুক, সাপ কতকিছু পোষে আর সেতো বিনা টাকায় মাত্র একটি গাছ পুষছে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন
মানুষের এরকম দু একটি কারিশমা থাকা প্রয়োজন। অতঃপর সময় শেষে নিজের প্রিয় ছেলেটিকেই যখন গাছটি তার মানুষ
খেঁকো শুড়, ডাল পালা পাতা দিয়ে আস্ত হজম করে ফেলে তখন তার অবর্তমানেই গায়ের লোকজন গাছটি সঙ্গে সঙ্গে কেটে
কুটে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তার সম্মতিরও কোন প্রয়োজন পড়ে না। তার আর কিছ্ইু করবার থাকে না। শুধুমাত্র হৃদয়ের
অনর্গল রক্তক্ষরণ সেখানে দেখতে পায়।
আর আজ ও তো নিজেই একটা মানুষ খেঁকো মানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে কারো কোন দোষ নেই। এর আগেও ওর স্ত্রী
অনেকবার ওকে সাবধান করেছে। এমনকি খাঁটি বাংলা ভাষায় বলেছে-
কয়লা খাবা তো আংড়া হাগবা। ব্ইুঝা শুইনা পা বাড়াবা।
যত পানিতে নামবা ততটুক্ইু ভিজবে তোমার।
তারপরও শিক্ষা হয় নি, লজ্জা হয় নি। ও চোখ মেলে দেখতে পায় সাকিফের মত লোহার গারদে দাঁড়িয়ে শত ব্যাখ্যায় ১৬৪
ধারায় জবানবন্দী দিচ্ছে।
অতঃপর পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হল।
এক ফাঁকে ও পেছন ফিরলে মেয়েটির দিকে চোখ পড়ে।

ওর হাতেও হাতকড়া পরাতে ব্যস্ত তারা। কিন্তু তার চোখে ভীতির কোন চিহ্ন নেই। চোখের কোনায় ঝিলিক দিচ্ছে ক্রর হাসি।
ওর দিকে তাকাতেই-
মেয়েটির সুন্দর মুখে দোযখের আগুন ছড়িয়ে হা হা ঠাস ঠাস শব্দে হেসে ওঠে-
স্যার, অনলি টেন মিনিটস, মাই বেবি। মাই স্ইুট বেবি। আই এম রেডি ফর ইউ। হয়ার আর ইউ গোয়িং, মাই বয়? কাম
অন।
স্ইুট স্যার! ও মাই বয়…

ও আর চোখে কিছ্ইু দেখতে পায় না। ও নিজেই কখন যেন একটি আস্ত মানুষ খেকো মানুষ হয়ে ওঠে। আর ওর ফাঁকা করা হা
দিয়ে ক্রমাগত ঢুকে যায় ওর ক্যাচরিওয়ালি পুরনো জেসমিন, পিউপাপিয়া লক্ষী ছেলেটি, পৃথিবীর সবচেয়ে আদরের মেয়েটি,
ওর মা, ওর বাবা, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন, কলিগ, প্রিন্সিপ্যাল স্যার…বাড়িওয়ালা একে একে ঢুকতেই থাকে সবাই । ও হা হা
গিলতে থাকে একেক টাকে… একেক বার…

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com