বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন

মানুষ, রুহানিয়াত ও মক্কা বিজয়: ফরহাদ মজহার

মানুষ, রুহানিয়াত ও মক্কা বিজয়: ফরহাদ মজহার

farhad mazhar blog farhad mazhar books pdf farhad mazhar farhad mazhar wiki farhad mazhari farhad mazhar facebook farhad mazhar kobita ফরহাদ মজহার farhad mazhar ফরহাদ মজহার pdf ফরহাদ মজহারের কবিতা ফরহাদ মজহার নাস্তিক ফরহাদ মজহার প্রথম আলো ফরহাদ মজহার ভাবান্দোলন ফরহাদ মজহার ব্লগ ফরহাদ মজহার কবিতা ফরহাদ মজহার বই ফরহাদ মজহারের ফরহাদ মজহার বই pdf ফরহাদ মজহারের কলাম ফরহাদ মজহারের বই ফরহাদ মজহারের কবিতা pdf

ঈদ মোবারক। আজ রমজানের শেষ দিন। ‘মানুষ’ নিয়ে বিনয়ের সঙ্গে দুই একটি কথা পেশ করব।

মানুষকে মুক্ত বা স্বাধীন ভাবতে পারা মানবেতিহাসে খুব বড়সড় ঘটনা। ব্যক্তিগত ভাবে এই মুক্তির স্বাদ বা স্বাধীনতা উপলব্ধি করা আর রাজনৈতিক সত্য হিশাবে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে মানুষের হাজার বছরের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। ইউরোপ মাত্র আধুনিক জামানায় এসে স্বাধীন ‘মানুষ’ আবিষ্কার করেছে।

কিন্তু তারও বহু আগে — আরও গভীর এবং আরও রুহানি অতলতা থেকে যে ঘোষণা দিয়ে ইসলাম যাত্রা শুরু করেছিল, সেটা ছিল খুবই সহজ এবং সরল: মানুষ মুক্ত, মানুষ স্বাধীন, সে ইহলোকে কারো কাছে মাথা নত করে না, শুধু যিনি গায়েব অথচ সর্বত্র বিরাজমান তাঁর কাছেই মানুষ নিঃশর্তে আত্মসমর্পন করে। শুধু ধারণা হিশাবে নয়, এই আদর্শের রাজনৈতিক বিজয় ঘটেছিল মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে। যদি বছরের হিশাব করি তাহলে বলতে পারি সেটা প্রায় ১৪৪১ বছর আগের ঘটনা। ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল ১৭৮৯ সালে। ফরাসি বিপ্লবেরও ১১৬০ বছর আগে মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের মহিমা প্রথম রাজনৈতিক সত্য হিশাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে রাসুলে করিম সাল্লালাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম যোদ্ধা এবং সেনাপতি হিশাবে মক্কা বিজয়ের ক্ষেত্রে যে অসাধারণ দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা নিয়ে নতুন করে বিশাল বই লেখা সম্ভব। মক্কা বিজয় হচ্ছে বিশ্ব ইতিহাসে ইসলামের প্রবেশ। মানুষের আল্লাহ প্রদত্ত অপার মহিমার বিজয় ঘোষণার দিন। তাহলে এবার নিজেকে সততার সঙ্গে বুকে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করুন, ইসলাম এই মহিমা ধরে রাখতে পারল না কেন? কেন হারালো? কিভাবে হারালো?
মানুষ শুধু স্বাধীন বা মুক্তই নয়, ইহলোকে যিনি সতত গায়েব কিন্তু সর্বত্র বিরাজমান মানুষ তাঁরই খলিফা। পরমার্থিক চিহ্ন। পরমার্থিকতার জীবন্ত সাক্ষী। বিস্ময়কর ঘোষণা। এখানেই সমগ্র পাশ্চাত্য এমনকি প্রাচ্যের সঙ্গেও ইসলামের ফারাক ঘটে যায়। অথচ ‘খলিফা’ ধারণাটিকে আজ অবধি মর্মার্থবিহীন ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা হিসাবে মুখস্থ করা হয়। এর দার্শনিক ও রাজনৈতিক মর্ম নিয়ে পর্যালোচনার কোন হিম্মত অর্জনের চেষ্টা হয় নি বললেই চলে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে রাজনীতির সূচনা হয়েছিল পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালে তার মর্ম নিয়ে নতুন করে ভাববার জন্যই কথাগুলো বলা।

প্রাথমিক ভাবে এটা পরিষ্কার ইসলামে ‘মানুষ’ চিহ্নের অর্থ গভীর। সহজ মনে হয়, কিন্তু ধরতে পারা অতো সহজ নয়। মানুষকে ‘আল্লাহ’র খলিফা’ বলার অর্থ হচ্ছে মানুষ স্রেফ জীবজন্তু না। বরং বোঝানো হয়েছে দিব্য-সম্ভাবনা হিশাবে মানুষই পরম রুহানি শক্তির অধিকারী, এই রুহানি শক্তির অধিকারীদের হাতেই রাব্বুল আলামিনের অপূর্ব সৃষ্টি বা ‘কুল মখলুকাত’ নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকবার কথা। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে ‘খলিফা’ শব্দচিহ্নের সংকেত দিয়ে আমাদের যা বোঝানোর চেষ্টা হয়েছিল তার কিছুই আমাদের কানে এসে পৌঁছায় নি। আমাদের সবকিছু নতুন করে শুনতে হবে, নতুন করে পড়তে হবে, নতুন করে ভাবতে হবে।

আফসোস আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলেছি।

এখন আমরা কোভিড-১৯ –এর ভয়ে ঘরবন্দী। মানুষের জন্য এর চেয়ে করুণ বা ট্রাজিক আর কি হতে পারে?

তবুও ঈদ মোবারক।

…………………………………
<এই সিরিজটি রমজানের শেষে (২৪ মে ২০২০) লিখতে শুরু করেছিলাম। চলছে…>

২. মানুষের মহিমা নিয়ে আমরা কথা শুরু করেছিলাম। মানুষ মুক্ত এবং স্বাধীন — এই উপলব্ধি গভীর রুহানি উপলব্ধি। মানুষকে আল্লার খলিফা ঘোষণা দিয়ে ইসলাম মানুষকে রুহানি স্তরের সম্মান দিয়েছে। আজকাল আমরা কথার কথা হিশাবে এইসব বলি। কিন্তু যে মানুষ প্রথম নিজেকে মুক্ত ও স্বাধীন সত্তা হিশাবে উপলব্ধি করেছিল সে নিশ্চয়ই এই হঠাৎ অনুভূতিতে শিহরিত হয়েছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন অনেকে ঘরদোর ছেড়ে পাগল, উন্মাদ, মাস্তান, ফকির, দরবেশ হয়ে গিয়েছিল। তাদের কাছে দুনিয়া তুচ্ছ মনে হয়েছে। কারণ মানুষ যখন আপন মহিমার স্বাদ নিজে একবার টের পেয়ে যায় আল্লা ছাড়া দুনিয়ার আর কোন শক্তি নাই তাকে কোন বিধি বিধানের নিগড়ে বেঁধে রাখতে পারে। জীব জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে রাস্তায়-অরাস্তায় পথে-অপথে নানান ভাবে নানান নামে এদের আমরা ইতিহাসে দেখি। অতীতে যেমন, এখনও। মানুষ বিচিত্র।

কিন্তু সমাজ তো ব্যক্তির পাগলামির ওপর চলতে পারে না। ব্যক্তি নিয়েই সমাজ। মানুষই যদি না থাকে তাহলে সমাজ কথাটার কোন অর্থ হয় না। অথচ ব্যক্তি আর সমাজ সমার্থক না। সমাজ অনেক ব্যক্তির যোগফলও না। তাহলে ব্যক্তি আর সমাজের মধ্যে সম্পর্ক বিচার করার ছহি পদ্ধতি কি হবে? ‘সমাজ’ কথাটা বুঝব কি করে? এটা মানবেতিহাসে হাজার বছরের তর্ক। সেই তর্কের নানান দিক আছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যক্তি কি সমাজের উর্ধে নাকি সমাজের ভেতরে? ব্যক্তির মধ্যে কি সমাজ নাই? সমাজের ভেতর কিম্বা বাহির কিভাবে বিচার করব? ইত্যাদি।

আমরা যে নিরিখ থেকে আলোচনা করছি সেই দৃষ্টিতে মানুষের মহিমা কথাটা কি স্রেফ ব্যক্তির মহিমা, নাকি সামাজিক ব্যক্তির অভিপ্রকাশ? এর একটাই উত্তর: মানুষ সামাজিক জীব, একমাত্র সামাজিকতার মধ্যেই মানুষের মহিমা মানবেতিহাস বিকশিত হতে পারে। রবিনসন ক্রুসো হয়ে সমাজ বিচ্ছিন্ন দ্বীপে কেউ শয়তান হোল নাকি মানুষ হোল তাতে কারো কিচ্ছু আসে যায় না।
কিন্তু এখন অধিকাংশের কাছে ‘মানুষ মুক্ত এবং স্বাধীন’ জাতীয় বাক্য একদমই ভোঁতা উচ্চারণ। কিন্তু আমি নিশ্চিত, নিজেকে মুক্ত এবং স্বাধীন সত্তা হিশাবে উপলব্ধির শিহরণ থেকে কোন মানুষই বঞ্চিত নয়। কিন্তু অধিকাংশের ক্ষেত্রে তা একটু ঢেউ তুলে মিলিয়ে যায়। নিরানব্বই ভাগ মানুষ সেই উপলব্ধির স্বাদ জীবনের কোন না কোন মুহূর্তে অনুভব করলেও বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় এই উপলব্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গণ্য করেন না। কিন্তু অনেকে এখনও স্বাধীনতার ভার সহ্য করতে পারেন না। তাঁরা ঘরছাড়া দিশেহারা হয়ে পড়েন।
ধরুন মানুষ মুক্ত এবং স্বাধীন এই উপলব্ধি যদি এক বা অল্প কয়েকজন ব্যক্তির না হয়ে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মধ্যে অনুভূত হতে শুরু করে। তখন কি হয়? সোজা উত্তর: সমাজ বদলায়। সেই বদল প্রথমে উপলব্ধির সামাজিক চর্চার মধ্যে ফুটে উঠতে শুরু করে। যেমন শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ইত্যাদি। সেটা সমাজের অন্তরের অভিপ্রকাশ কিম্বা আন্তরিক (subjective) দিক। অনুভূতি বা উপলব্ধির প্রকাশ সবসময়ই বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তখন উপমা, কল্পনা, উৎ্প্রেক্ষা প্রতীক ইত্যাদি নানান চিহ্নে উপলব্ধিকে মানুষ যথাসাধ্য প্রকাশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আন্তরিক দিক ক্রমশ স্পষ্ট, দৃঢ় ও ব্যাপ্ত হলে তা আর আন্তরিক রূপ মাত্র হয়ে থাকে না। মানুষ মুক্ত এবং স্বাধীন তার একটা যৌক্তিক, সার্বজনীন ও নৈর্ব্যক্তিক রূপ তৈরির চেষ্টা চলে। মানুষের অন্য সকল বৃত্তির চেয়ে বুদ্ধি যখন সর্দারি করতে শুরু করে তখন সামাজিক উপলব্ধির সত্যকে সার্বজনীন এবং যুক্তি পরম্পরায় অনিবার্য প্রমাণের তাগিদ তৈরি হয়। পাশ্চাত্য এর নাম দিয়েছে দর্শন। এখন আমরা যা ‘দর্শন’ হিশাবে বুঝি তা অতি সম্প্রতি কালের দোকানদারি।

যৌক্তিক, সার্বজনীন এবং নৈর্ব্যক্তিক হবার সাধনা করলেও দর্শনও আদতে আন্তরিক নির্মাণ বা আদর্শ। সমাজ দর্শনেও সন্তুষ্ট হয় না। সমাজ আপনকার অন্তরের একটা দৃশ্যমান, প্রত্যক্ষ রূপ দেখতে চায়। বুদ্ধি ও যুক্তির শৃংখলা দিয়ে উপলব্ধির সার্বজনীন ও অনিবার্য রূপ সমাজ খাড়া করবার চেষ্টা করে। এই তাগিদে প্রণোদিত হয়ে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের একটি শক্তিশালি ধারা আধুনিক রাষ্ট্রকে মানুষের আন্তরিক (Subjective) উপলব্ধির নৈর্ব্যক্তিক (Objective) রাজনৈতিক রূপ হিশাবে দাবি করতে শুরু করে। মানুষ মুক্ত ও স্বাধীন তার নৈর্ব্যক্তিক রূপ হচ্ছে পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্র। অর্থাৎ ইউরোপে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তার মধ্যেই মুক্ত ও স্বাধীন মানুষের আবাস ও বিকাশ সম্ভব। দাবি উঠল, যা যৌক্তিক তাই নৈর্ব্যক্তিক, সত্য বা বাস্তব (What is rational is actual, what is actual is rational )।

কিন্তু পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্র কি মুক্ত ও স্বাধীন মানুষের নৈর্ব্যক্তিক রূপ হতে পেরেছে? যে রুহানিয়াতের জমিন থেকে ইসলামের আবির্ভাব তার নৈর্ব্যক্তিক পরিণতি কিম্বা গন্তব্য কি আধুনিক কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র? এটাই একালের প্রশ্ন। পাশ্চাত্য রোমান আইন, গ্রিক দর্শন খ্রিস্টিয় ধর্ম তত্ত্ব দিয়ে মানুষকে যেভাবে বুঝেছে আধুনিক কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। আধুনিক পাশ্চাত্য মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতাকে যেভাবে বুঝেছে আধুনিক রাষ্ট্রের রূপের মধ্যে সেভাবেই মানুষকে প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশ্চাত্য নিজেকে যেভাবে বুঝেছে সেভাবেই নিজেকে আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ করেছে। এই বোঝাবুঝির সীমাবদ্ধতা আমরা এখন চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। এই রাষ্ট্রে মানুষ আবার নিজের পায়ে নিজেই শৃংখল পরেছে। এই রাষ্ট্র আইন করে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে। তার কাজ হচ্ছে স্বাধীন ও মুক্ত মানুষকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মধ্যে রাখা যায় তার জন্য নিত্য-নতুন কৌশল আবিষ্কার করা। এটা এখন স্পষ্ট এই রাষ্ট্র মুক্ত মানুষের নৈর্ব্যক্তিক রূপ হতে পারে না। মানুষকে পুঁজির গোলামে পরিণত করাই তার কাজ। তাই কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সম্পন্ন আধুনিক রাষ্ট্রকে উৎখাত করা ছাড়া মানুষের আর কোন গত্যন্তর নাই।

কিন্তু আজ আমাদের চতুর্দিকে যে ইসলাম আমরা দেখি তার পক্ষে কি মানুষের মহিমা নিয়ে আদৌ কোন গভীর চিন্তা করা সম্ভব? পাশ্চাত্যের নজিরের পরিবর্তে কি ধরণের সমাজ গড়ে তোলা দরকার তার কোন স্বপ্ন কি ইসলাম দেখাতে পারে? ইসলাম কি তার কোন নজির হয়ে উঠতে পারে? ভাবুন।
মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে যার বীজ তৌহিদের সেনাপতি রসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ঐতিহাসিক ভাবে বপন করেছিলেন সেটা কি রাষ্ট্রকে খোদা বানাবার জন্য? রাষ্ট্রকে সার্বভৌম শক্তি হিশাবে কায়েম করবার জন্য? রাষ্ট্রের নিগড়ে মানুষকে ফার্মের মুর্গির মতো খাঁচা বন্দী করে মানুষের মহিমা ম্লান করে দেবার জন্য? আজ আমরা চোখের সামনেই দেখছি পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন এবং কোভিড-১৯ মহামারির মধ্য দিয়ে পুরানা রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে। গড়ে উঠছে বিশ্বপুঁজির সরাসরি হুকুমদারির অধীন ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও নজদারির বৈশ্বিক কেন্দ্র। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষমতার এই বৈশ্বিক কেন্দ্রীভবন, এটাও কি তাহলে ইসলামেরও অভীষ্ট? ইসলামও কি বিশ্ব ক্ষমতা চায়? বিল গেইটস হতে চায়? বহুজাতিক কোম্পনির সি ই ও হওয়াই কি মোমিনের কাজ? নাকি তার কাজ ইহলোকে আল্লার খলিফা হওয়া। মুক্ত ও স্বাধীন মানুষের রুহানি বিকাশের সহায়ক হওয়া। আল্লার খলিফা হিশাবে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডসহ সকল প্রাণের হেফাজত কারী হওয়া, যেন ভাইরাস নামক কোন মহামারি আল্লার গজব হিশাবে কোন দিনই মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে না পারে।

খ্রিস্টান, হিন্দু, ইহুদি বা তথাকথিত ‘কাফের’দের হটিয়ে দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রে মুসলমানদের ক্ষমতায় বসিয়ে দিলে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম হয়ে যাবে? নাকি ইসলাম নিয়ে আমাদের নতুন করে আরও গভীর ভাবে ভাবতে হবে। মানুষ কি ইসলাম মনে রেখেছে, নাকি ভুলে গিয়েছে? কেন কোরানুল করিমে মানুষকে ‘আল্লার খলিফা’ বলা হোল? সেটা তো মুসলমানদের সম্পর্কে বলা হয় নি, সকল মানুষ সম্পর্কেই বলা হয়েছে। কিন্তু শয়তানের ফুসলানিতে মানুষ সব ভুলে গিয়েছে।

যে শুধু অন্যের ওপর ক্ষমতা কায়েম করতে চায়, অন্য মানুষকে শৃংখলিত করতে চায়, অপরকে দাস বানাতে চায় — সেই মানুষের কথাই কি কোরানুল করিমে বলা হয়েছে? তাদের কথা কি যারা নিজেরাই খোদা বনে যেতে চায়? তাদেরকথাবার্তা শুনলে মনে হয় তারা নিজেদেরই আল্লাহ জ্ঞান করে। এমনকি আশ্চর্য, যে আসনে বসে অনেকে ফতোয়া দিয়ে থাকেন সেটা নমরূদের সিংহাসনের মতোই। সেই আসনে বসে ফতোয়া দানকারী ঠিক করে দিচ্ছেন কে বেহেশতে যাবে, আর কার কপালে জাহান্নাম খচিত রয়েছে। এদের হাত থেকে আল্লা যেন আমাদের রক্ষা করেন।

মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের যে রূহানি সফরের শুরু সেই কাফেলার গন্তব্য বহুদূর। মানুষের মহিমা কায়েম করাই সেই সেনাবাহিনীর রূহানি সংকল্প। রূহানি রাজনীতি। জিহাদ। এটা থেমে যাবে সেটা ভাববার কোন কারন নাই। কোভিড-১৯ ঝাঁকি দিয়ে সেটাই আবার বুঝিয়ে দিল।

যে বুঝেছে সে বুঝে গিয়েছে। যে বোঝেনি তার কানে সীসা এবং বুকে মোহর মারা হয়ে গিয়েছে। তারা খেঁকি কুকুরের মতো রাস্তার পাশে চিৎকার করুক। কাফেলা এগিয়ে যাক।

২৭ মে ২০২০

৩. মক্কা বিজয় নিয়ে লিখছি। এবারের রমজানেই লিখতে উদ্বুদ্ধ বোধ করেছি। শুরুও করেছিলাম রমজানেই। ঈদ শেষ হোল, কিন্তু প্রেরণাটুকু থামে নি।

মক্কা বিজয়ের লক্ষ্যে রাসুলে করিম বেরিয়েছিলেন ১০ রমজানে। রাসুলুল্লাহ এবং তাঁর সেনাবাহিনী পুরা দিনই রোজা রাখেন। আর কুদায়েদে পৌঁছে তাঁরা ইফতার করেন। দেখা যাচ্ছে জালিমদের বিরুদ্ধে লড়াই রমজানের রোজা, পরহেজগারি ও এবাদত-বন্দেগি থেকে আলাদা কিছু নয়। তুলনা করুন, আমরা রমজানকে এখন কি বানিয়েছি!

মক্কা বিজয়ের দিন জোহরের নামাজের পর তিনি ক্কাবার সামনে দাঁড়ালেন। হাতে একটি লাঠি। তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘সত্য হাজির, মিথ্যা পলাতক, মিথ্যাকে অবশ্যই, এভাবেই পালাতে হয়’ (বনিইসরাইল-৮১)। কিন্তু সত্য নিজ গুণে হাজির হয় নি। মিথ্যার বিরুদ্ধে দ্বীনের সেনাপতিকে সশস্ত্র লড়তে হয়েছে, আল্লহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সহায় ছিলেন।

কি ছিল মক্কার সেই সত্য? মানুষে মানুষে রক্তে রক্তে গোত্রে গোত্রে গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে জাতিতে জাতিতে কোন ভেদ নাই। সবাই মানুষ। কিন্তু নিজেদের তারা রক্তের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোত্র ও গোষ্ঠিতে বিভক্ত করেছে। মানুষের সমাজ গঠন না করে তারা ঝগড়া, হানাহানি ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে মানুষের অস্তিত্বকেই বিপ্নন করে তুলেছে। নিজ নিজ রক্ত, বর্ণ, গোষ্ঠ, গোত্র, জাতির জন্য আলাদা আলাদা মূর্তি বানিয়ে সেই মূর্তিকেই তারা খোদা বানিয়েছে, সেই খোদারই তারা পূজা করে। সেই সকল মূর্তিকে আল্লার অংশীদার বানিয়েছে। শেরেকি মানুষের রুহানি মহিমার বিনাশ ত্বরান্বিত করে। নিজের মহিমা ভুলে গিয়ে মানুষ নিজেকেই নিজে ভূলুন্ঠিত করে। তারা নিজ নিজ গোত্র বা গোষ্ঠির মূর্তি বানায়। পরস্পরের মধ্যে ফ্যসাদ, যুদ্ধবিগ্রহ হানাহানিতে নিজেদের বিনাশ নিজেরাই ত্বরান্বিত করে।

এটাই ছিল সেইসময় রক্তবাদী, গোত্রবাদী ও গোষ্ঠবাদী আরবদের অবস্থা। রসুল বললেন, মানুষে মানুষে এই বিভক্তি ও বিভাজন চলবে না। মানুষের জাতি একটাই। তার নাম মানুষ। মানুষের মধ্যে ভিন্নতা ও বৈচিত্র থাকবে, কারণ মানুষের মহিমা নানা ভাবে প্রকাশের জন্যই এই ভিন্নতা ও বৈচিত্র দরকার। তাদের প্রতিপালক তাই সবাইকে এক রকম তৈরি করেন নি। কিন্তু রক্ত, গোষ্ঠ, গোত্র, বর্ণ, জাতি বা সম্প্রদায়ে মানুষ বিভক্ত থাকতে পারে না। সত্য এসেছে, মিথ্যা পালিয়েছে, মিথ্যাকে এভাবেই পালাতে হবে।

পৌত্তলিকতা স্রেফ বাইরের মূর্তি বানিয়ে পূজা না, অন্তরের পুতুল বানানও বটে। তখন সেই পুতুলও বাইরের মূর্তির মতো মানুষে মানুষে ভেদ ও বিভাজনের কারন হয়ে ওঠে। যুদ্ধ ও বিগ্রহে মানুষের বিনাশ ত্বরান্বিত করে। এই বিভেদ ও বিভাজন মূর্তি পূ্জার চেয়েও ভয়ানক। বাইরের পুতুল ভাঙা যায়, কিন্তু মনের মূর্তি ভাঙা দুঃসাধ্য। এখন যেমন যার যার মনের মূর্তি অনুযায়ী মানুষ সম্প্রদায়, জাতি, দেশ, ভূখণ্ড, ইত্যাদিতে বিভক্ত, তেমনি নিজ নিজ মতাদর্শের পূজাতেও পরস্পরের সঙ্গে মানুষ যুদ্ধে লিপ্ত, হানাহানিতে রত, রক্তপাতে ভেজা। পুতুল বাহ্য জগতে মাটি, পাথর, লোহা, ব্রোঞ্জ বা অন্য যে কোন কিছু দিয়েই বানানো যায়, কিন্তু কল্পনার, বাসনার, বুদ্ধির বা স্বপ্নের মূর্তি যখন তখন বানানো যায়, সেইসব মূর্তিও হয় হাজার হাজার। লক্ষ লক্ষ। মানুষ যদি চোখে দেখার মূর্ত পুতুল বানাতে পারে, তাহলে অদেখা মূর্তিও বানাতে সক্ষম। তারপর পরস্পরের বিরুদ্ধে নিজ নিজ পুতুলের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ভাগ হয়ে যেতে পারে মানুষ। বিভক্ত মনুষ্য সমাজ তখন তাদের নিজ নিজ মূর্তিকে বলে ‘বিশ্বাস’। দাবি করে তার মূর্তিই সত্য, অন্যের মূর্তি মিথ্যা।

অথচ যিনি মূর্তি নন, নিরন্তর গায়েব বা অনুপস্থিত, তার প্রতি ঈমান বা নিঃশর্তে আশ্রয় প্রার্থনার কথা তারা ভুলে যায়। নিজদের তৈরি মূর্তি রক্ষার জন্য তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। মূর্তিতে ‘বিশ্বাস’ আমাদের কাছে এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে যে ভিন্ন চিন্তা বা মতাদর্শের মানুষকে আমরা আর মানুষ বলে গণ্য করি না। মুসলমান নিজেদের সম্পর্কে যে মানসিক ও কাল্পনি্ক মূর্তি বানিয়েছে তার ফলে তারা নিজেদের মধ্যেই হানাহানিতে ব্যস্ত। নিজেদেরই তারা দিন দিন ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তারা ভুলে গিয়েছে যিনি নিরন্তর গায়েব, সর্বত্র বিরাজ করেন, তাঁর বাহ্যিক মূর্তি যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি কল্পনার, বাসনার, আকাঙ্ক্ষার কিম্বা বুদ্ধির মূর্তি তৈয়ারিও নিষিদ্ধ, মানুষ সেই মূর্তিরও দাস হয়ে পড়ে।

ভেতরে বাইরে তিনি সর্বত্রই গায়েব। অথচ তিনি আছেন বলেই আমরা সকলেই আছি। যিনি গায়েব, তাঁর কোন মূর্তি হয় না।

ইসলামে ‘গায়েবে ঈমান’ কথা হিশাবে যেমন কঠিন, ধারণা হিশাবেও গভীর। রুহানিয়াতের ভিত্তি এখানে। যিনি গায়েব, অথচ সবসময়ই আছেন, তাঁর সালাত কায়েম করাও সোজা ব্যাপার না। খুব সোজা ধারণাও নয়।

মানুষকে অন্তর বাহির সকল প্রকার মূর্তি ও পৌত্তলিকতা থেকে নিরন্তর মুক্ত ও স্বাধীন রাখার জন্যই নিঃশর্তে গায়েবে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছে ইসলাম। মানবেতিহাসে এটি এক বিশাল বৈপ্লবিক ঘটনা। মানুষ যেন কখনই নিজের পায়ে নিজেকে শেকল না পরায়, নিজের স্বাধীনতা ও মুক্তির মহিমা বুঝতে পারে তার জন্যই ইসলাম পৌত্তলিকতা বিরোধী। নিজে পৌত্তলিক থেকে পোত্তলিকতাকে ‘কুফর’ বলবার তামাশা ইসলামে নাই। নিজেকে আগে কুফরি থেকে মুক্ত করতে হবে। মানুষকে স্বাধীন ও মুক্ত রাখাই ইসলামের রাজনীতি। মানুষের এই রুহানি সফর রুদ্ধ করা অসম্ভব। মুক্ত ও স্বাধীন মানুষের ধারণাকে ইসলাম রুহানিয়াতের অতি উঁচু স্তরে নিয়ে গিয়েছে।

ভোগবাদী সমাজে কামনা বাসনার মূর্তি ভাঙ্গা খুবই দুঃসাধ্য। এই সমাজে মানুষ নিজেই নিজের কামনা বাসনার দাসে পরিণত হয়। বিশেষত পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায়। তাই পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই পর্বে মক্কা বিজয়ের তাৎপর্য নতুন করে ভাববার সময় হয়েছে। কোন রক্ত, গোষ্ঠ, গোত্র, বর্ণ, জাতি বা সম্প্রদায়ে মানুষ বিভক্ত থাকতে পারে না। ঘোষণা হোল, সত্য হাজির, মিথ্যা পালিয়েছে, মিথ্যাকে এভাবেই পলায়ন করতে হয়।

কিন্তু পৌত্তলিকতা বিরোধিতার রাজনৈতিক মর্ম কি আমরা মনে রেখেছি? বুঝেছি? ইসলাম কি নিজেকে সকল মানুষের দ্বীন হিশাবে হাজির করবার সামর্থ অর্জন করতে পেরেছে? আমরা কি আদৌ চিন্তা করতে সক্ষম? ইতিহাস পাঠ করি?

সেই সময়ের ক্কাবার পরিস্থিতি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিরই আদি প্রতিরূপ মাত্র। ক্কাবায় তখন মজুদ ছিল ৩৬০টি মূর্তি। রসুল হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়ালেন। একেকটি মূর্তির দিকে তাঁর লাঠি তাক করে ধাক্কা দিলেন, মূর্তিগুলো পেছনে হেলে পড়ল। রুহানিয়াতের পথ হচ্ছে মানুষের ভেতর বাহিরের মূর্তিকে এভাবেই হেলিয়ে দেওয়া, অপাসারণ করা। সত্য হাজির, মিথ্যা পলাতক, মিথ্যাকে অবশ্যই এভাবে পালাতে হয়।

মক্কার দরজায় দাঁড়িয়ে রসুল করিম বললেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লার কোন শরিক নাই। আল্লাহ তার খাদেমকে সাহায্য করেছেন, তিনি কেবল দুষ্কর্মে সহযোগীদের পলায়নে বাধ্য করেছেন। মক্কার উপাসনালয়ের হেফাজত এবং হাজিদের পানি পান করানো ছাড়া অন্য সব সুবিধা, অথবা রক্ত, অথবা সম্পত্তি মালিকানার দাবি আমি বিলোপ করলাম।

অর্থাৎ রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়সাল্লাম সকল প্রকার রক্ত ও আভিজাত্যের দাবি বিলোপ করে শুধু ক্ষান্ত হন নি, সম্পত্তি মালিকানার দাবিও বিলোপ করেছেন। আল্লার সৃষ্ট দুনিয়ায় মানুষ সহ প্রতিটি জীব বা প্রাণের জৈবিক ও আত্মিক চাহিদা মেটাবার ‘হক’ বা অধিকার আছে। মানুষ তার রুহানি সত্তার বিকাশের জন্য আল্লার সৃষ্টির বরকত আস্বাদনের অধিকার রাখে। কিন্তু আল্লাহ কোন মানুষকে জমি বা ধন সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে দুনিয়ায়া পাঠান নি। রাসুল ও খোলাফায়ে রাশেদিনের জীবন যাপন থেকে এই বিষয়ে আমরা অনায়াসে শিক্ষা লাভ করতে পারি। মক্কায় গোত্রে গোত্রে গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে হত্যা হানাহানি বন্ধ করবার জন্য রসুল রক্তপণ কঠোর করলেন। বললেন, হে কোরাইশ, আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে পৌত্তলিকবাদের ঔদ্ধত্য এবং পূর্ব পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা তুলে নিয়েছে। মানবজাতি আদম থেকে আসা এবং আদম মাটি থেকে। অতএব মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ থাকতে পারে না। এরপর তিনি কোরানুল করিম থেকে পাঠ করলেন:

“হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যেন তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার”। অর্থাৎ রক্তবাদ, গোত্রবাদ বা গোষ্ঠবাদের ঘোষণা দিয়েও মানুষকে বৈচিত্র ও বিভিন্নতার নিরাকরন ঘটানোর কথা বলেন নি। বরং বৈচিত্র এবং ভিন্নতার মধ্য দিয়েই মানুষ ‘এক’-কে উপলব্ধি করুক, ‘এক’-এর সাক্ষী হোক, আল্লার রসুল সেটাই বলেছেন।

এরপর তিনি বললেন, “হে কোরাইশ। তোমাদের নিয়ে আমি এখন কি করব বলে তোমাদের মনে হয়? তারা জবাব দিল, ভালো, আপনি একজন সদাশয় ভ্রাতা, এক সদাশয় ভ্রাতার পুত্র’। তাঁর উত্তর ছিল অসীম ক্ষমার, তিনি বললেন, “তোমরা যার যার কাজে যাও, কারণ তোমরা এখন মুক্ত’। যে কোরেশরা তাঁকে হত্যার হেন কোন ষড়যন্ত নাই করে নি, যারা তাঁকে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছে, তিনি তাদের ক্ষমা করে দিলেন।

মানুষের মহিমা ঘোষণা এবং মহিমা কায়েমের আলোকে মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পর্কে ইঙ্গিত দেবার জন্য আমরা ইতিহাস থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছে মাত্র। বলা বাহুল্য, এই মহিমা স্রেফ রোমান্টিক কল্পনা বা ধারণা নয়। এর রাজনৈতিক মর্ম সুদূর প্রসারী। আমরা তিনটি পয়েন্ট উল্লেখ করে আপাতত এই কিস্তি শেষ করব।

১. কোন বিশেষ সুবিধা ভোগের অধিকার কারো নাই। সম্পদের ব্যবহার কিম্বা ও সম্পদ অর্জন নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু বিশেষ সুবিধা ভোগের হাতিয়ারে পরিণত করবার জন্য সম্পদ বা সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ । অর্থাৎ বিশেষ সুবিধা ক্ষমতার দ্বারা হোক, কিম্বা হোক আইনী হাতিয়ার দিয়ে ব্যাক্তিগত মালিকানা কায়েম করে, – ইসলাম তা বরদাশত করে না। সুস্থ সবল ও রুহানি জীবন যাপনের জন্য ভোগের অধিকার ইসলাম অস্বীকার করে না, অস্বীকারের প্রশ্নই আসে না। জীবন যাপনকে আরও উন্নত ও আনন্দময় করবার চেষ্টা মানুষের থাকবেই, কিন্তু সফলতার ফল অল্প কিছু ব্যক্তির কুক্ষিগত হবে, এটা ইসলামের নীতি হতে পারে না। তাই সকলের উপকার নিশ্চিত করবার জন্য জমি,পুঁজি, জ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির ওপর আইনী মালিকানার অধিকার ইসলাম যে মানে না, তা মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়েই ঘোষিত হয়ে রয়েছে।

যা কিছু সৃষ্টি সবই আল্লাহর, তাঁর কোন শরিক নাই। মালিকানা দাবির তর্ক শেরেকির সঙ্গে যুক্ত। শেরেকি ইসলামে গর্হিত অপরাধ। মক্কায় মানুষের অধিকার কায়েমের জন্য আইনী কিন্তু সম্পত্তির মালিকানার মধ্য দিয়ে বিশেষ সুযোগ বিলোপের ঘোষণার তাৎপর্য সুদূর প্রসারী। অভিজাত ও ধনি শ্রেণীর বিশেষ সুবিধা বিলোপ করা হয়েছে। সম্পত্তি মালিকানা ব্যবস্থার বিলোপ ঘটানো হয়েছে, মানুষ যেন নিজের রুহানি শক্তির স্বাদ উপলব্ধি করে। এই স্বল্প দিনের দুনিয়ায় মানুষ কোন কিছুরই মালিকানা দাবি করতে পারে না, কারণ মৃত্যু সেই মালিকানাকে তামাশায় পর্যবসিত করে। আল্লার রাহে সব উৎসর্গ করে দেওয়া অর্থেও মানুষ রুহানিয়াত উপলব্ধি করতে সক্ষম। ত্যাগের চেয়ে মহৎ আনন্দ মানুষের আর কিছুই হতে পারে না।

২. ইসলামে কোন রক্তবাদ, গোত্রবাদ, গোষ্ঠবাদ, জাতি, বর্ণ, ভেদাভেদ নাই। একই যুক্তিতে কোন জাতীয়তাবাদ, ভূখণ্ডবাদ, ভাষাবাদ, সংস্কৃতিবাদ ইত্যাদিও নাই। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, এলাকা ভেদে নানান প্রকার জীবন যাপন — ইত্যাদির ভিন্নতা বা বৈচিত্র আছে, যেন আমরা পরস্পরকে জানতে পারি, পরস্পরের সঙ্গে কথোকথনে নিষ্ঠ হতে পারি। ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে ভিন্নতা এবং বৈচিত্র দ্বারাই আমরা পরস্পরকে চিনি, জানি, ভালবাসি, সম্পর্ক গড়ে তুলি, কিন্তু মনুষ্য সমাজে কোন ‘অপর’ নাই। সকলেই বাপের ঔরসে মায়ের গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেছে।

৩. অতএব ইসলামে রুহানি রাজনৈতিক কর্মসূচি হচ্ছে সকল মানুষকে এক করা। ঐক্যের পথের সকল বৈষয়িক বা আত্মিক বাধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। আল্লাহ যে রুহানি গুণ সম্পন্ন মানুষকে তাঁর খলিফা ঘোষণা করেছেন সেই রুহানি মহিমাকে জয়ী করা এবং রুহানিয়াতকে অন্তরের আলো হিশাবে শুধু নয়, বাইরে নৈর্ব্যক্তিক সত্য হিশাবে কায়েম এসবই মানুষের আত্মিক ও রাজনৈতিক পরমার্থ।

অতএব সত্য হাজির, মিথ্যা পলায়ন করতে বাধ্য। আর এভাবেই, মিথ্যা পলায়ন করে।

৩০ মে ২০২০

৪. ‘কালো মানুষদের জীবনও জীবন’ (Black Lives Matter)। আমি একটি ঐতিহাসিক ছবি মনের মধ্যে আঁকবার চেষ্টা করছি।
রাসুলে করিম সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের অভিযানে। তিনি সবার আগে উটে করে যাচ্ছেন। কিন্তু রসুলের সঙ্গে একই উটে কাকে বসা দেখছি? একজন কৃষ্ণ মানুষ। কালো মানুষ। কেন? ব্লাক লাইভস ম্যাটার। না, ইসলাম ঘোষণায় কিম্বা শ্লোগানে সন্তুষ্ট না। মক্কা বিজয়ে রাসুলে করিমের সঙ্গে একই উটে চড়ে কালো মানুষ মক্কা জয় করেছে। বিজয়ের পর রসুলের সঙ্গে দুইজন কালো মানুষ কাবায় প্রথম প্রবেশ করে। কোরেশ গোত্রের কোন অভিজাত নয়। ইয়েস। ব্লাক লাইভস ম্যাটার। আমাদের জগত জয় করতে হবে।
রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওসাল্লামের মক্কা বিজয়ের বহু বছর পর যখন ব্লাক লাইভস ম্যাটার শ্লোগান প্রথম কানে এসেছিল, তখন মনে মনে বলেছিলাম, وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا ( সুরা বনি ইস্রাইলঃ ৮১) ওয়া কুল যায়াল হাক্কু, ওয়া যাহাক্কাল বাতিল, ইন্নাল বাতিলা কা-না যাহুক্কা’। নিজেকে বারবার বলেছি, ‘ ‘সত্য’ হাজির, ‘বাতিল’ পালিয়েছে, যা ‘বাতিল’ তাকে অবশ্যই এভাবে পালাতে হয়। ‘আল হক’ বা অর্থাৎ যিনি একমাত্র সত্য, ‘এক’, যিনি একই সঙ্গে বিশেষ এবং সামান্য, তিনি স্বয়ং হাজির। ‘হক’ এসেছে, অর্থাৎ আল্লাহ স্বয়ং হাজির, ঐতিহাসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উপলব্ধি হিশাবে মানুষের মধ্যে তিনি উপস্থিত। মানুষের রুহানি আত্মবিশ্বাস ও জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের রূপ নিয়ে তিনি স্বয়ং প্রমাণ করছেন তিনি আছেন। তিনি কোন রক্ত, বর্ণ, আভিজাত্য, শ্রেণী কিম্বা নারী-পুরুষ ভেদ মানেন না। বিভিন্নতা এবং বৈচিত্র তাঁর কুদরত, তাঁর আনন্দ, তাঁর সৃষ্টিশীলতা। কিন্তু বিশেষ কোন প্রাকৃতিক ভিন্নতাকে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক কিম্বা সাংস্কৃতিক ‘সুবিধা’ তিনি কখনই দেন না। বরদাশত করেন না। রক্ত, বর্ণ বা লিঙ্গের জন্য কাউকে বিশেষ ক্ষমতা দেননি, ক্ষমতা জাহির বা প্রয়োগ করবার অধিকারও দেন নি।

অতএব কালোমানুষদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের হাজার হাজার বছরের নৃশংস পীড়নের বিরুদ্ধে জিহাদ ন্যায়সঙ্গত। বর্ণবাদী সমাজ, রাষ্ট্র, চিন্তা সংস্কৃতি ইত্যাদির বিনাশ ও বিলুপ্তির সময় হাজির হয়েছে। সত্য হাজির, মিথ্যা এখন পালাতে বাধ্য। আমাদের রুহানি উপলব্ধি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে তিনি আছেন। আমাদের মধ্যেই। আমাদের আমল, আমাদের সক্রিয়তা আমাদের জিহাদ আমাদের রুহানি প্রজ্ঞার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রকাশ ঘটছে। এভাবেই ঘটে। তাই ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার — কালো মানুষদের জীবনও জীবন, আল্লা কৃষ্ণাঙ্গদেরও স্রষ্টা – এটা আবার চোখে আঙুল দিয়ে বোঝাবার সময় হয়েছে। যা কিছু ‘বাতিল’ যা কিছু এতদিন আমাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, যা কিছু আমাদের সাদা কালো বিভাজন ঘটিয়েছিল, আমাদের অন্ধ করে রেখেছিল, আজ সেই অন্ধকার কাটতে বাধ্য। দিব্য নূরে জগত আবার উদ্ভাসিত হোক।

এই শ্লোগানটি দেওয়া শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে ট্রেইভন মার্টিনকে গুলি করে হত্যার দায় থেকে জর্জ জিমারম্যানকে খালাস দেবার প্রতিবাদে। হ্যাশট্যাগ দিয়ে ডিজিটাল জগতে হাজির হয় #Black_Lives_Matter শ্লোগান। বোঝার সুবিধার জন্য একে বাংলায় আপনি নানান ভাবে অনুবাদ করতে পারেন। যেমন, বলতে পারেন, কালো মানুষদের জীবনকেও হিশাবে গুণতে হবে। তাদের বাদ দিলে হবে না। তারাও ইতিহাস। যিনি সাদা কালো শ্যমল হলুদ নাক বোঁচা নাক লম্বা বেঁটে দীর্ঘ ইত্যাদি নানান ধরণের মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি মহান কারিগর। যিনি স্রষ্টা, তিনি বৈচিত্রেরও স্রষ্টা। এমন এক ‘বিশ্ব বাগান’ আমাদের জন্য তিনি তৈরি করেছেন, যেন সেই বাগানে আমরা পরস্পরকে জানি, বুঝি, সম্পর্ক পাতাই এবং তাঁর গুণ গাইতে পারি। বৈচিত্র আছে বলেই ‘এক’-এর উপলব্ধি সম্ভব। নইলে তিনি একটি ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল কারখানা বানাতেন, আর আমরা সব একই রকম একই মাপের একই সুরত নিয়ে সারি সারি একই সিলছাপ্পড় মারা হয়ে বের হয়ে আসতাম।

কৃষ্ণাঙ্গ ট্রেইভন ১৭ বছরের কিশোর। হাঁটছিল রাস্তায়, তাকে জর্জ জিমারম্যান গুলি করে। জিমারম্যান দাবি করে সে আত্মরক্ষার জন্য গুলি করেছে, ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় নি। বিক্ষোভের মুখে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, কিন্তু বিচারে জুরি তাকে খালাস দেয়। ফুঁসে ওঠে মানুষ, শ্লোগান তৈরি হয় ‘কৃষ্ণাঙ্গের জীবনও জীবন’, ব্লাক লাইভস ম্যাটার। পুলিশের হাতে এভাবে গুলি খেয়ে মরেছে বহু কালো মানুষ।

গত ২৫ মে যখন জর্জ ফ্লয়েডকে গলার ওপর হাঁটু দিয়ে প্রায় নয় মিনিট চেপে ধরে পুলিশ ডেরেক শেভিন শ্বাস বন্ধ করে মারল। হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে শ্বাস বন্ধ করে মারার ভিডিও যখন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে গেল – মার্কিন জনগণ ফুঁসে উঠল। জর্জ ফ্লয়েরডকে হ্যান্ডকাফ পরা পেছন মোড়া অবস্থায় রাস্তায় উপুড় করে শোয়ানো। পুলিশের হাঁটুর চাপে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বার আগে জর্জ বারবারই বলেছিল, ‘আই কান্ট ব্রিথ’, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।

যে ব্যবস্থার মধ্যে আমরা এখন বাস করছি, আমরাও দুনিয়ার কোথাও নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আমাদের গলার ওপর হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে আছে আইনশৃঙ্খলার হিংস্রতা, মাটিতে ফেলে মারছে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। তাই আমরাও ‘নিঃশ্বাস নিতে পারছি না’। মৃত্যুর আগে কালোমানুষ জর্জের সকাতর আর্তিও সারা দুনিয়ার সকল মজলুমের অসহনীয় অবস্থার আর্তনাদ হয়ে উঠেছে।

একই ভাবে হয়তো কোভিড-১৯ যেভাবে আমাদের ফুসফুস চেপে ধরে মারছে তার কারনেও আমরা ‘নিঃশ্বাস নিতে পারছি না’। এই অবস্থার অবসান হতে হবে। জর্জ ফ্লয়েড‘কালো মানুষের জীবনও জীবন’ –এই কথাটা শুধু মানবাধিকারের ভাষ্য হিশাবে নয়, ‘জীবন’ নামক ধারনার মধ্যে আমরা কাকে অন্তর্ভূক্ত করি আর কাকে বাদ দেই – সেই প্রশ্নটিকেই আবার নতুন করে আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে। যাদের আমরা ‘মানুষ’ বলে গণ্য করি না, তাদের জীবনও জীবন। তারাও মানুষ। ‘মানুষের মহিমা’ কথাটাকে আমাদের নতুন করে আবিষ্কার করতে হচ্ছে।

ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণীর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা দরকার। তাদের বয়েস চল্লিশেরও কম। এলিসিয়া গার্জিয়া (Alicia Garza), পাত্রিসে কালরস (Patrisse Cullors) এবং ওপাল তোমেতি (Opal Tometi)। নামগুলো দিচ্ছি, কারন আশা করব বাংলাদেশের তরুণরা এদের সম্পর্কে জানার জন্য আরও আগ্রহী হবেন।

কিন্তু ইসলাম এবং মক্কা বিজয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক কি? সম্পর্ক একদমই গোড়ার জায়গায়। ইসলাম গড়ে উঠেছে কালো মানুষদের জন্য, মোহাম্মদ (সা.)কে আল্লার রসুল হিশাবে আরবে যারা শুরুতে মেনে নিয়েছিলেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন দাসদাসী। প্রথম চল্লিশ জনের মধ্যে তিরিশ জনের বেশী ছিলেন তাঁরাই। কৃষ্ণাঙ্গ। মোহাম্মদ (সা) আমেনা বিনতে ওয়াহাবের গর্ভে আসার আগে তাঁকে সন্তান স্নেহে সকল প্রকার স্নেহ মমতা দিয়ে গড়ে তোলার জন্য যাঁকে আল্লাহ দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন, আবদুল্লাহ যাঁকে মক্কার ক্রীতদাসদাসীদের বাজার থেকে আমেনার দেখাশোনার জন্য কিনে এনেছিলেন, তিনি একজন কৃষ্ণাঙ্গ।

বিয়ের দুই সপ্তাহ পর আব্দুল্লাহর বাবা আব্দুল মোত্তালিব তাঁকে সিরিয়ার সওদাগরী কাফেলায় পাঠালেন। নববধূকে সেই বিরহ-কাতর প্রতিটি মূহূর্তে সঙ্গ দিয়েছিলেন সেই কৃষ্ণাঙ্গ রমণী। যিনি রসুলের জননী আমেনা বিনতে ওয়াহাব যখন গর্ভবতী হয়েছিলেন সে ব্যাপারে আমেনার কথা থেকে প্রথম যিনি রাসুলের আবির্ভাবের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন তিনি সেই কৃষ্ণাঙ্গ নারী। আমেনা গর্ভবতী হয়েছেন সেটাও আমেনাকে তিনিই নিশ্চিত করেন। ইনি সেই নারী যিনি অসুস্থ আমেনাকে আদরে যত্নে সুস্থ রাখতে কোন প্রকার কার্পন্য করেন নি।
সওদাগরী কাফেলা ফিরে আসতে শুরু করল মক্কায়। যিনি গোপনে খোঁজ নিতেন আবদুল্লাহ ফিরেছেন কিনা, তিনি এই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। আবদুল্লাহর মৃত্যুর খবর পেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে যিনি ঘরে ফেরেন তিনি এই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। আমেনা স্তব্ধ হয়ে যান। কিন্তু যাঁর শুশ্রুষায় তিনি নিরাপদে আল্লার রসুলকে জন্ম দিতে পেরেছিলেন, তিনি এই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। শিশু মোহাম্মদ জন্ম গ্রহণের পর নব জাতককে দুহাতে তুলে আমেনা বিনতে ওহাবের পাশে যিনি রাখেন তিনি এই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। শুধু কি তাই?

অভিজাত গোত্রবাদী কোরেশরা সন্তানকে দুধ খেয়ে বড় করতে ধাত্রী হিশাবে মক্কার বাইরে মরুবাসী বেদুঈন মায়েদের কাছে লালন পালনের জন্য দিত। মোহাম্মদও হালিমার দুধ খেয়েছেন। গোত্রবাদী কোরেশ যে ইতিহাস লেখে সেটা গোত্রবাদী ও বর্ণবাদীদের ইতিহাস। – কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাস সেই ইতিহাস থেকে জ্ঞানে বা অজ্ঞানে বাদ যায়। যেহেতু আমরা এখনও প্রধানত গোত্রবাদী আরবদের ইতিহাসকেই ইসলামের ইতিহাস হিশাবে পড়ি, তাই সেই ইতিহাসের বাইরে আর কোন খবর নেই না, আমরা হালিমার নাম জানি, কিন্তু এতিম মোহাম্মদকে যিনি তাঁর জন্মের আগে থেকেই মৃত্যু অবধি লালন পালন করেছেন তাঁর নাম জানি না।

মোহাম্মদ (সা.) ছ বছর বয়েসে যখন পৌঁছালেন, আমিনা মনস্থ করলেন তিনি আবদুল্লার কবর দেখতে মদিনায় যাবেন। সেটা ছিল খুবই কষ্টকর সফরের সিদ্ধান্ত, কিন্তু আমেনা কারো নিষেধ মানলেন না। মদিনায় আবদুল্লার কবর দর্শন শেষে একটি কাফেলার সঙ্গে ফেরার পথে আমেনা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুস্থ আমেনার জন্য কাফেলা একদিন অপেক্ষা করল, তারপর কাফেলা আমেনা, ছ বছর বয়েসী মূহাম্মদকে মরুভূমিতে রেখে মক্কায় চলে গেল। কিন্তু যিনি রয়ে গেলেন তিনি সেই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। আমেনা শেষ বারের মতো যখন কথা বলতে পেরেছিলেন তাঁকেই বললেন, আমি যাচ্ছি, আজ থেকে তুমিই মোহাম্মদের মা। তুমি আমার দেখাশোনা করেছ, এখন মোহাম্মদকে লালন পালনের ভার আমি তোমার ওপরই ন্যস্ত করলাম। ইনি আমেনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কোনদিনই ভঙ্গ করেন নি। মোহাম্মদ সাল্লাহুল আলাইহে ওয়াসাল্লাম সারাজীবন সেই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাকেই ‘মা’ বলে ডেকেছেন। যিনি এলে আল্লার রসুল সম্মান জানাবার জন্য বসা অবস্থা থেকে উঠে যেতেন, কপালে চুমু খেতেন। ইসলামের গোত্রবাদী, বর্ণবাদী ও রাজতান্ত্রিক ইতিহাস তাঁর নাম নিতে ভুলে গিয়েছে। কার্যত মুছে ফেলেছে। তার নাম কি আমরা আদৌ মনে রেখেছি? আমরা নিজেরা কি জানি?

কে এই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা? যাঁর উত্তরসূরি্ কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের নেতৃত্বে আজ বর্ণবাদ বিরোধী জনগণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শহরে শহরে লড়ছে? ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের তোয়াক্কা না করে জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে? তাঁর নাম বারাকা। মুহাম্মদ (সা.)-এর জননী। উম্মুল মোমেনীন। যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রসুলকে লালন পালন করেছেন। যাঁর সুশিক্ষা ও জননীমূলক ভালবাসায় সিক্ত রাসুলে করিম ‘মানুষের মহিমা’ কথাটিকে প্রতিদিন উপলব্ধি করেছেন। কোরেশদের বর্ণবাদ, গোত্রবাদ ও সকল প্রকার ‘বিশেষ’ সুবিধা ও আভিজাত্য ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছেন, আবার মক্কা বিজয়ের পর সেই বর্ণবাদী ও গোত্রবাদী কোরেশদের ক্ষমাও করে দিতেও কসুর করেন নি। কারন ইসলাম দয়া এবং শান্তির ধর্ম। কিন্তু রসুলের মৃত্যুর পর তারাই আবার গোত্রবাদ ও বর্ণবাদে ফিরে গিয়েছে। ইসলামকে রাজতান্ত্রিক ধর্ম এবং শাসনে পরিণত করেছে।

বিবি খাদিজা বিনতে খোয়ালিদকে বিয়ে করার পর বারাকাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। দেবার পরও বারাকা মোহাম্মদ (সা.) কে ছেড়ে যান নি। তাঁর যুক্তি ছিল সন্তানকে ছেড়ে তিনি কোথায় যাবেন? রাসুলে করিমের জীবনের প্রতিটি ছত্রে ছত্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ভূমিকা লেপ্টে রয়েছে। কালো মানুষদের মুক্তির লড়াই থেকে ইসলামকে কার্যত আলাদা করা দুঃসাধ্য। দাস প্রথা, বর্ণবাদ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সকল প্রকার ভেদ ও অসাম্য থেকে মুক্তির জন্যই ইসলাম। বর্ণবাদ, গোত্রবাদ , রাজতন্ত্রের অবসান হতেই হবে। জালিমকে তার ক্ষমতা ও আভিজাত্যের অহংকার থেকে উৎখাত করে মানুষের মহিমা কায়েম করতেই হবে। ইসলামে এর অন্যথা হতে পারে না। তাই অবাক হবার কিছুই নাই যে মক্কা বিজয়ের সময় রসুলের সঙ্গী ছিলেন জননী বারাকাহ এবং উসামা বিন যায়েদ। তাই মক্কা বিজয় একই সঙ্গে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মানুষের মহিমার বিজয়, সেখানে কোন সাদা/কালো নাই। আছে শুধু দিব্য সম্ভাবনায় পূর্ণ মানুষ। মক্কা বিজয়ের দার্শনিক ও রাজনৈতিক মর্ম বুঝতে হবে, রসুলের মৃত্যুর পরে গড়ে ওঠা গোত্রবাদী কোরেশদের গোত্রবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলাম বোঝা যাবে না।

আর মনে রাখুন, মক্কা বিজয়ের পর রাসুলে করিম কাবা ঘরে কোন অভিজাত কোরেশকে নিয়ে প্রবেশ করেন নি। যাদের নিয়ে প্রবেশ করে ছিলেন তাঁরা উভয়েই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ – কালো মানুষ। একজন ছিলে বেলালা এবং আরেকজন উসামা। জ্বি, ‘ব্লাক লাইভস ম্যাটার’। মানুষের মহিমা মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঘোষিত হয়েছে। কালো মানুষের জীবনও জীবন, শুধু এই ঘোষণা দিয়ে ইসলাম ক্ষান্ত থাকে নি। কালোমানুষদের সঙ্গে নিয়েই মক্কা জয় করেছে, তাদের নিয়েই রসুল মক্কা বিজয়ের পর কাবায় প্রবেশ করেছেন। ধর্মের নামে যাদেরকে আল্লার ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই দাস ও মজলুমের বিজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের মহিমা কায়েম করেছেন । ইসলাম সকল প্রকার দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করবার জন্যই হাজির হয়েছে। সাদা কালো হলুদ শ্যমল সকল মানুষের মহিমা ধারণ করেই ইসলাম মানুষের ‘দ্বীন’ বা জীবন ব্যবস্থা হয়েছে। আল্লা মানুষকে তাই দুনিয়ার তাঁর খলিফা হিশাবে পাঠিয়েছেন, কারো দাস হবার জন্য নয়।

রাসুলে করিম, আরব দেশে জন্ম নিয়েছেন, কিন্তু তিনি শুধু আরবদের রসুল নন, শুধু তাদের নবী নন। সারা দুনিয়ায় সকল মানুষের সকল মজলুমের রাসুল। অথচ আজ ইসলাম গোত্রবাদী, বর্ণবাদী ও রাজতন্ত্রী আরবদের ইতিহাসে পযবসিত হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস পড়লে এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মনে হয় ইসলাম যেন শুধু আরবদের ব্যাপার! । ‘ব্লাক লাইভস ম্যাটার’ – কালোদের ইতিহাসও ইতিহাস, তেমন অন্যদেরও। উপমহাদেশে বর্ণবাদ, জাতপাত, রাজতন্ত্র, রাণীতন্ত্র, ফ্যসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইও ইসলামেরই ইতিহাস।

ইতিহাস পড়ুন। পড়ুন কিভাবে গোত্রবাদী ও বর্ণবাদী কোরেশদের দম্ভ চূর্ণ করা হয়েছে। মানুষের মহিমা কায়েমের এই ইহলৌকিক লড়াই থেকে ইসলামকে আলাদা করা ভুল এবং অনৈতিহাসিক। রাসুলের ওফাতের পর, গোত্রবাদী এবং বর্ণবাদী কোরেশদের ইতিহাসকে প্রাধান্য দিয়ে আজ অবধি ইসলামের ইতিহাস লেখা হয়েছে। মানবেতিহাসের রুহানি সফর এগিয়ে নিতে হলে গোত্রবাদী, বর্ণবাদী এবং সকল প্রকার রাজতন্ত্রী বয়ানের কলংক থেকে ইসলামকে মুক্ত করতে হবে। ‘ইসলাম’ সম্পর্কে যেসকল বাতিল, কুফরি ও মিথ্যা আমাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সেই সকল অন্ধকার বা জাহেলিয়াত থেকে মুক্তির দিনকে আসন্ন করে তুলতে হবে।

ভাবুন, রাসুলে করিমের সঙ্গে আগে আগে একই উটের পিঠে বসে মক্কায় প্রবেশ করছেন উসামা বিন যায়েদ। কাবাঘরে রসুলের সঙ্গে এক সঙ্গে প্রবেশ করছেন উসামা এবং বেলাল ইবনে রাবাহ। রসুলের নির্দেশে বেলাল আজান দিচ্ছেন: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
এই ইসলামকে চিনুন। প্রতিটি জীবনই আল্লার মহিমায় গুণান্বিত। দিব্যতা সম্পন্ন। অতএব ব্লাক লাইভস ম্যটার।

৭ জুন ২০২০

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com