রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন

রহমান হেনরীর একগুচ্ছ কবিতা

রহমান হেনরীর একগুচ্ছ কবিতা

আগুয়ান ওয়েবম্যাগ, কবিতা, পদাবলি, গদ্য কবিতা, আধুনিক কবিতা, রহমান হেনরী, কবি রহমান হেনরী, প্রিয় কবিতা, কবিতা প্রতিযোগিতা, Rahman Henry, agooan webmag, poem, love poem, romantic poem, littlemag, agooan,

দোয়েলের জন্য এলিজি

যশোরেশ্বরীর দধিজনশ্রুতি— ভেস্তে গেলো;
এখন, বিধ্বস্ত বনশ্রী পেরিয়ে, দিগন্তে,
তোমার উঠান ছুঁতে যাই— আহ দোয়েল,
উদ্বাস্তু হতে হতে, কমদামি কাগুজে নোটের ভিতর
স্বর গুঁজে— বসে আছো, বোবাধ্বনি!

তোমার দেখা না পেয়ে, নির্যাতিতের আর্তনাদ
শব্দমান হতে চেয়েও, আটকে যাচ্ছে: আলজিভে
গ্রামাঞ্চলে, লাঙলের ফলায় গেঁথে, এখনও
উঠে আসে— ছটফট করতে থাকা
কেঁচোর অবয়ব; অপেক্ষা করে
কীটপতঙ্গ আর শুয়ো পোকার দল
তোমার শিস শুনতে না-পেয়ে, অনেকগুলো
সম্ভাব্য ভোরের উদ্ভাস— থমকে থাকছে
অস্ফুট আলোর আবছায়ায়

তেল চিটচিটে ধাঁধার ক্যানভাস ফেঁড়ে
অপ্রতিরোধ্য সূর্যের মতো, কবে বেজে উঠবে— দয়াল?

পঙ্খিনীমঙ্গল

এই যে এমন আলো এবং আলোর পটভূমি
আড়াল করে জ্বালিয়ে দিচ্ছো: রাতের নগ্নরীতি
কুমেরুতে রৌদ্রতাপ ও তুষারে সম্প্রীতি
সেই ঘটনা দেখতে কেমন: বুঝতে চেয়ে তুমি
আমাকে তার নির্জীবতার পরীক্ষাগার করো?
মানুষ-গ্রহের অন্তিমে এক দখিনা জঙ্গলে
বৃক্ষজীবন লাভ করেছি— সহস্রাব্দ আগে
বিবর্তনের কারুকর্মে, পঙ্খিনীমঙ্গলে,
আবার আমার পাথরচোখে তোমার ডানা জাগে
এসো সুদূর, এই বিজনে আবাস এবার গড়ো!
বদলে-যাওয়া-জলবায়ু গুপ্তজ্ঞানেই জানে:
পঙ্খি ছিলাম। আমার ডানাই ভিজেছিলো জলে
আমিই পুড়েছিলাম— তোমার যুগল-অগ্নিতলে
ধ্বংস শেষে, আরেক নতুন জন্মালো; এইখানে

সুরক্ষা

অন্ধকারই পরিপূর্ণ নদী— প্রশান্ত, সরল
তার ভিতরে স্নান করছে: রাধাস্নিগ্ধ রাত
নিকটে নীরব, মুগ্ধ— আমার বিরাট
ভুবন-শ্মশানে স্থিতু; আনন্দের রোল—
সেখানেই নৃত্যগীত উছলিয়া ওঠে
আমি তাকে স্পর্শ করি: অন্তহীন হিম
আমাকে দেখাতে চায়— সকল বঙ্কিম
[সে কি] আঁধারের দেহভঙ্গি? অথবা রাত্রির?
অহিনী-চুম্বনে নীল মেখে যাচ্ছে ঠোঁটে
এবং অদুগ্ধে ঝরছে— শাদা ফেনা, ক্ষীর
দেখো হে, স্বাধীন-বোবা পরমেশ্বর,
স্নানের সংকেতে কত মসিবৃষ্টি ঝরে
বিষের বন্যায় ভাসে— ভিটেমাটি, ঘর
সুরক্ষা কি চিরন্তন সাপিনী-উদরে?

আর্তবৃংহতি

হাতির দাঁতের পালঙ্ক
নাই আমার। কম দামি কাঠের চৌকিতে
শুই। ঘুমাই কিংবা জেগে থাকি। স্মৃতির কান বরাবর
ভেসে আসে— মাহুতের গান
কর্মে
ও বিশ্রামে
বৃহদারণ্যেই বসবাস—
সর্বত্রই দেখি:
দলবদ্ধ হাতি— অথচ নিঃসঙ্গ
নরখাদকের তাড়া খেয়ে বেড়াচ্ছে…
কঙ্কালের উপর জমছে কঙ্কাল: তৈরি হচ্ছে
অগুনতি শাদা পাহাড়
সারিসারি পিঁপড়ে
ওইসব পাহাড় পিঠে নিয়ে
কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যাচ্ছে!
প্রতিনিয়ত
আফ্রিকায়, এশিয়ার দেশে দেশে
শুনতে পাচ্ছি— আর্তবৃংহতি

পলাতকা


বিরল-মুহূর্তে, তুমি বলেছিলে:
‘ছুঁয়ে দেখো, এইখানে মন’
উষ্ণ সেই যথাস্থান স্পর্শ করে
শিহরণে কেঁপে গেছে হাত
অনুভব-প্রাঙ্গণে খেলে গেছে
অচেনা খুব— হাওয়ার কম্পন
এই তবে আদি উৎসারণ!
নবজাতকের যত ভাবনাসংঘাত
বুঝতে পারেনি তবে, মন ফুঁড়ে
মাতৃসুধা উঠে আসে— ঠোঁটে!
আজও তো শরীরস্রোতে
সেই সুধা ভিন্ন নামে-বর্ণে প্রবাহিত…
উৎস-মানচিত্র একই
পঞ্জিকার বয়ঃক্রমে শুধু তার নব ব্যবহার
এভাবে শিখিয়ে দিয়ে, অসময়ে,
ফেলে যাচ্ছো— বিপুল সংকটে
আমি সেই স্মৃতিলিপ্ত অন্ধকারে
বসে ভাবি: হে স্বর্ণসন্ধ্যার
পলাতকা পাখি, যে নাটক শেষ হলো
পুনরায় হবে অভিনীত?

রূপকথা ও শৃগসম্প্রদায়

বাদশা’র মনে হলো: মিথ্যা বলা ভালো
এবং দিনের গায়ে
রাত্রির আলকাতরা-আলো
ব্যাপক মাখিয়ে দেয়া— অপরাধ নয়
অতএব, ঝাঁকঝাঁক শৃগালের দল
দিবসেই চেটে দিলো— প্রাচীন দিনের কোনও বিগত সঞ্চয়:
কবরের মাটিমাখা বাদশা’র পয়মন্ত কম্বল
‘সত্যকে স্বীকার করা খুবই অপরাধ’
—এইকথা মনে হলো তার;
সংগোপনে মৃত সেই লোভী বাদশা’র
অন্তরে গজালো— তীব্র অমরত্ব-সাধ:
অতঃপর, বাদশা আর শৃগসম্প্রদায়ে
তছনছ করে দিলো রূপকথা। সিংহাসনে পুনরাবৃত একই গান—
লাভে-লোভে পঞ্জিকা রঞ্জিত লালে; রাজ্যপাট: পৃথিবীর নীরব-শ্মশান

ভাদুরে বিষাদ

ভাদ্র মাসের
মাঝামাঝি দিন
ভদ্র বাতাস
যাতনা রঙিন
বহু উঁচু ছাদ
ছুঁয়ে— দূরে যায়
হু হু উড়ালের
ডানা ডানা মেঘ
কী কথা যে কয়
শব্দ আধেক
মন বলে কারও
নাম ধরে ডাকে
ভাদুরে বাতাস
গড়াগড়ি খায়
আদুরে রোদের
পাশে বসে থাকে
আজ কেন হায়
মনে পড়ে যায়
সুদূরের দেশে
নম্র তোমাকে

পরিণতি

একটা আঁতুড়ঘরের স্মৃতিকেই আমরা
আকাশ বলে সম্বোধন করছি। নৈঃসঙ্গ্যের মতো
আত্মীয় হয়ে ওঠা সেই সম্বোধন, এমন একটা
জীবন সমগ্রতার মধ্যে মিশে থাকে যে— এমনকি
আঁতুড়জীবনকেই মনে হয়: বেড়ে ওঠা
তবু, জন্মমুহূর্তের ভিন্নতাই, সেই গুপ্ত চিত্রকর
যে কিনা এঁকে দিচ্ছে— নদীময় বর্ণিল রেখা
প্রশান্ত আকাশি রঙের জল, একদিন ভিজিয়ে দেবে
তোমাকেও; এবং অন্তিমের অরণ্যছায়ার দিকে
হেঁটে যেতে যেতে, মনে হবে: আঁতুড়ঘরের
প্রান্তরেখার নামই— বিদায়
উপলব্ধির সেই বর্ণবিনিময়ের জন্য কোনই বনপাল নেই
শুধু মচমচ করে শুকনো পাতা; আর আছে— লাল
শিশিরবিন্দুর মতো রক্তফুল

পাঠোদ্ধার

স্বচ্ছ কাচের ভিতর দিয়ে ঠিকরে বেরোনো আলো— স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল
দেখো, তার মুখমণ্ডল— প্রশান্তি নয়, বরং ভয়ের মিহি সুতায় জ্বলছে
আলোকরশ্মির প্রভা; সহযোদ্ধা পরিবেষ্টিত হতে চাইছে— এমন নয়
কিংবা এমনও নয় যে, একা হতে চায়। তার উপলব্ধির শরীরে সিরিঞ্জ
গেঁথে গেছে, প্রবিষ্ঠ হচ্ছে ফোঁটা ফোঁটা সন্দেহ। অস্বস্তি আর ফুরাবে না
ভয় আরও জেঁকে বসবে; তার অহমিকাময় বুকসমগ্রে
উপর্যুপরি খঞ্জর চালাবে সন্দেহ। দেখো, তার মুখচ্ছবি আসন্নের যে বার্তা
ছড়াচ্ছে— সেখানে আত্মবিশ্বাসের উচ্চকণ্ঠ ছাপিয়ে, প্রকট হয়ে উঠছে:
ভয় ও আশঙ্কার জলছাপ।

কোনও পূর্বাভাস দরকার নেই; সেই মুখমণ্ডল যে পড়তে পারছে
সেই-ই পড়ছে— আনকোরা ভোরের কাগজ। বদলে যাবে পঞ্জিকা,
গাছ ও পাখিদের রং-বদলের খবর নিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নতুন স্রোত
সেই আসন্নকে: স্বাগত।

জৈবনিক

ছায়া তার সহসা সরিয়ে নিচ্ছে— গগনশিরিষও
তবু আমি, প্রকাশ্যত, রৌদ্রালোকে দাঁড়িয়ে রয়েছি
কেবল অমৃত নয়; বহু দেবদেবতার কাঙ্ক্ষার বিষও
বাধ্য-নদের মতো, নিশিদিন, রক্তের প্রবাহে বয়েছি
সমতলচ্যুত হলে— নিরুপায়, সেজেছি গিরিশও
বয়ন-বারণ; তাই, অনিকেত পাখিদের মতো
বৃক্ষে-ডালে থেকেছি প্রস্তুত আর হালকা নিদ্রারত
দশচক্রে হয়েছি কয়েকবার প্রবাদের ভূতও!
তারপর, সামলে নিয়েছি অতিদ্রুত
ফলেছি সুন্দর ফল— রাজন্যের মাকালের গাছে
গণমানুষের অংশভাক হয়ে, জনতারও গঞ্জনা সয়েছি
জনান্তিকে, নূতন কী কথা আর বলিবার আছে?

এখন উজানে যাবো, আকস্মিকে, শোনো জলধর,
কানকো পেতেছি— কানে মেখে দাও: প্লাবনের স্বর

সন্ধ্যারূপ কথা

কাঠঠোকরার ডাকের মতো
অপূর্ব সাইরেন
বেজে উঠলো— মফঃস্বলের বোবাটে রাস্তায়
টিকাটুলি-গোপীবাগে
হলুদ, সরু লেন
হঠাৎ পদপিষ্ট— কোনও সন্ত্রাসী-সন্ধ্যায়

সমঝোতা কৌশল

মত
এবং ভিন্নমতের
পাঁজর ফুঁড়ে
বয়ে যাচ্ছে— গুঞ্জনমুখর হাওয়া

তোমার ডালিমগাছে
টুনটুনিগুলো যে-গান গাইছে
তার অনুবাদ— দু’রকম হতে পারে;
কিন্তু মানব-পরিভাষায়
আন্তঃজলপ্রবাহের মতো
তৃতীয় স্রোতও কম বইছে না!

পাখিরা— জলবায়ু ও নিসর্গের বার্তাবাহক,
কারও মুখপাত্র নয়;

সীমান্ত তাদের জাতীয়তা নির্ধারন করে না।

ডাগর ডালিমের দিকে চোখ রেখে
ভিন্নমত করতে দাও— মানুষ এবং পাখিদের;
অন্যথায়, ঐকমত্যে পৌঁছাবো কী করে?

বন-সমাচার

দিনদুপুরে অজল-কুয়ার পাশে
দুয়ার খুলে রাত্রি নেমে আসে
বনভূমি— নির্জনতার বান
দিনের মাঠে রাতের ক্যারাভান
সন্ধ্যা মাখায় ভাদাল-দূর্বা ঘাসে
শেয়ালমুখো চাঁদের হঠাৎ উঁকি
সন্দেহময় বাতাস ডেকে আনে
শুকনো কুয়ায় অযথা উন্মন
পাতাপাখির শব্দবিহীন গানে
বনের ভিতর বাড়ছে অনেক ঝুঁকি…
এমন অবাক পক্ষিহীনা বন
তোমার দেশে, তোমার দেশে দেশে
অগোচরে, বাড়ছে সারাক্ষণ
অসহ জট— চাঁদের এলোকেশে

পরিবীক্ষণ

সভাপণ্ডিতেরা নির্ভরযোগ্য নয়
অধ্যাপকগুলো শুধুই টিকচিহ্ন
আর এমসিকিউ-প্রিয়
না হলে তো, জীবাশ্মের ছায়ায় ঘুমন্ত
গল্পগুলোই— আমাদের ইতিহাস হতে পারতো!

আমরা এখন মামলার আর্জিকে রায় ভেবে
ন্যায়-বিচারের বৃক্ষরোপন করছি

বিছুটিলতার মধ্যে ভেসে ওঠা
আহ নির্বোধ দিনের কল্পনা
হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের মহিমা নয়
বরং ঘুঘুদের ডিম থেকে দশ শতাংশ ছানা ফুটলেও
বলা যেতো— উন্নয়ন হলো

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com