বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন

রহমান হেনরী’র কবিতাগুচ্ছ

রহমান হেনরী’র কবিতাগুচ্ছ

রহমান হেনরী কবিতা গদ্য কবিতা বাংলা কবিতা আগুয়ান rahman henry poem poet rahman henry agooan webmag

উপরোধ

আষাঢ়ের পিপীলিকা ব্যস্ততম;
বিঘ্নিত কোরো না তার শ্রম—
আসন্ন শীতের কথা একবার ভাবো!

আমরা তো কুয়াশার তাঁবু চিরে চিরে
শীতেরও ওপারে চলে যাবো!

পিঁপড়েদের মতো, এই আমারও— ব্যস্ততাটুকু ক্ষমো,
জীবিকা জীবনটাকে গিলে খায়, এত ধীরে ধীরে:
অন্তে গেলে, চেনা যায়— সে দুঃস্থ-আশ্রম।

লক্ষ্মীট্যারা

উন-নয়ন নারী—
লোকে হয়তো, লক্ষ্মীট্যারা ডাকে
আমি যত পাঠ করি তাকে
ততই নিশ্চয়ে বলতে পারি:
‘ঘাপলা আছে— বস!’

এ কোনও সামান্য নয়— প্রচুর দানবী

এর পায়ে— উন, নত, ধান্দাল-কবি
মধুর অধিক কিছু পেয়ে গেছে রস

এই নারী যেটা দেখে, শুধু দেখে সেটা
ট্যারাদৃষ্টি অন্যকিছু নেয় না আমলে
আকারে-ইঙ্গিতে শুধু এইটুকু ব’লে
শিলবিলাতীর চাষে, কৃষকের বেটা
আবার জুড়েছে মাঠে হাল—

প্রসাধনরঞ্জিত মিথ্যা ফেটে, এখনই প্রকট হও— সত্যের কঙ্কাল!

২০৩০ পরবর্তী

তখন, দৈনন্দিন কাজের বাধ্যবাধকতা বলে
কিছুই থাকবে না: তোমার এবং আমার
এরকম এক সময়, বলিভিয়ার লা পাজ থেকে
এক শ কিলোমিটার দূরবর্তী একটা লেকের পাড়ে
যেদিন সূর্যাস্ত দেখতে বসবো; এবং
কিছুক্ষণের জন্য তোমার কথা ভাববো;
তারও এক ঘন্টা পর, তোমার ওখানে সূর্যাস্ত

এসবের ফলে, কেবল পঞ্জিকার পৃষ্ঠাগুলোই
হলুদ রঙে পেকে উঠবে, তা নয়—‌ বরং
ততদিনে, আমাদের ছেলেমে’রাও
প্রণয়ের যন্ত্রণা ও বিরহের উপভোগ্যতা সম্পর্কে
বেশ খানিকটা ধারণা পেতে শুরু করবে‌

নারীবাস্তবতা

সে তার ছায়ার অন্ধকারে, অতল সন্ধান করে— হায়,
সেই মেয়ে ডুবে যেতে চায়

ছায়া তার সন্ধ্যা আর প্রত্যূষের পাখিই যেনবা,
ঘাসের সবুজে বসা চটকা-পোকা-মন চমকায়;
নীরবেই ডেকে বলে: ‘তুই আমাকে খা’

একদিন, ছায়াটাই ডাইনী হলো, যখন শরৎ:
বিপৎডাঙার মাঠে, অপয়া সন্ধ্যায়,
ছায়ারই তো শব্দ বাজে— ‘কোঁৎ’

মেয়েটাকে, অবশেষে, নিজের ছায়াই গিলে খায়!
—এইসব জনশ্রুতি: জনপ্রিয় হচ্ছে, এশিয়ায়—

যে গেছে, সে চলে গেছে

যে গেছে, সে চলে গেছে— ফুরিয়ে হারিয়ে যাওয়া গান
এখানে আশার অবসান
অসম্ভব। এইখানে, জীবনের মুখ— ম্লান নয়

দুঃখেরও অধিক সঞ্চয়
আছে, আমাদের সর্বদেহ-মনে
এখানে আকাশভরা মেঘ, পৃথিবীকে গর্ভবতী করে
গুপ্তহত্যা প্রতিদিন— একাকী ও নীরবেই প্রতিরোধ গড়ে

সামান্য সবুজ বনে
অন্ধকার চিরে ফোটে আলোকসজ্জার মতো ফুল

এখানে নদীর ভাঙাকূল
অগণন মৃত্যুতেও শ্মশানের নীরবতা নয়
এখানে, দিনের অবসান— অসম্ভব

সারাক্ষণ, অগণিত স্বপ্নের জন্ম-উৎসব
রোদেলা-স্রোতেলা বহু গান—

যে গেছে, সে চলে গেছে— সে-ই শুধু বিস্মৃত ও ম্লান

একমুঠো এই আকাশ

একমুঠো এই আকাশ নিয়ে, স্বপ্ন দেখছি— বড়
তোমার লাখো-স্বপ্ন এটার সঙ্গে যুক্ত করো
নিদ্রাকাতর গ্রহের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র এলে
দেখবো খুঁজে শব্দ কিসের— মোমের আগুন জ্বেলে
এই মনে নেই ওসব কচু বিস্ফোরণের ডরও

একমুঠো এই আকাশ, তাতেই ব্রহ্মাণ্ডের বাড়ি
তৈরি এবার। ঢুকবে তুমি? এসো তাড়াতাড়ি
অতলান্তের তলদেশে গোপন কোনও রেলে
চাপবো দু’জন, যেতে যেতে সীমান্তে তার গেলে,
দেখতে পাবো— নতুন একটা মরু-কালাহারি

সেই ঘটনা আর কিছু নয়— থমকে দেবার ছলা
কিন্তু আমার স্বপ্নগুলো দারূন রেতঃস্বলা
জন্ম যদি সুরের গোলাম— তুমিই যদি গান
মরু চষেই বানিয়ে নেবো সমুদ্র-উদ্যান
ছানবো বরং রুদ্রকরে পাতাল-নাগের গলা

একমুঠো এই আকাশ— আমার বিরতিহীন-প্রাণে
লক্ষ প্রাণের ঠাঁই। মনটা তবু তোমাকে আজ টানে
সৌরজগত অন্ধকারে একটি রবি ছাড়া
পড়ছে খসে ভুবনজোড়া সাজের পলেস্তারা
রকেট-গতির ছন্দে, এসো, আপন প্রণয়যানে!

একলা নাও

হাঁটতে গেছি— অচেনা এক নদীপাড়ে
নদীর ভিতর, জলে
মাঝি আমায় নৌকা নিয়ে সাঁতার দিতে বলে

ইচ্ছে হলো, তাকেই প্রশ্ন করি:
এই নদীটার নাম?
—পূর্ণিমাসুন্দরি।

শুনেই চমকালাম
পূর্ণিমাতে নৌকা কেমন ভাসে!

কিনার ঘেঁষেই নৌকা— ওই তো, আ রে!
মাঝি কেবল হাসে—

এবং বলে: বাহে,
জানেন কি-না, একলা নাও তো সাঁতার জানে না হে!

সুন্দর

সুন্দর উদ্বিগ্ন নয়— ভীত নয়;
ফলে— সে সুন্দর

কে তার পকেট কেটে নেবে
কে তার গোপন সিন্দুক ভেঙে লুটে নেবে হীরা-জহরত
কে তার বাপের ভিটা
জাল দলিলের বলে— বেদখল দেবে
এ রকম সহস্রেও পরোয়া করে না

তাকে কেউ দুমড়ে-মুচড়ে দিলে, পুনরায়
উলম্বে দাঁড়ায়। শরীরের ধুলা ঝেড়ে
নির্বিকার হেঁটে যায়— নির্বিঘ্নের দিকে

তাই সে সুন্দর।

সুদিনের নামে

সুদিনের নামে, এখনই উড়বে ধুলো
রাজার লোকেরা এদিকে আসছে—
বুকে বুকে আজ লুকাও সুবাসগুলো

শরীরে জখম? রক্ত পড়ছে চুইয়ে?
হাসিমুখ থাকো। কুশল জানাইও:
ভালো আছি… —[মাথা নুইয়ে]।

আমরা তো মহাভদ্র নাগরিক—
যা বলে ওরা; আর যাহা যাহা করে,
সব ভালো— সবই ঠিক

সুদিনের নামে, এখনই উঠবে ঝড়
জীবন যতই দুমড়ে মুচড়ে যাক—
বোবাসংসারে, রক্ষা কোরো হে ঘর

চোখের সাম্রাজ্য গড়ো

সতর্ক দূরত্ব রাখো। উঁকি মেরে দেখো:
মেঘের উপরে মেঘ, তারও উপরে— শুধু মেঘ

মুদ্রিত পৃষ্ঠায়
বোতলে বোতলে
চা ও কফির মগে
জন্ম নিচ্ছে— চোখ;
তাদেরকে জানাও: যেন, উঁকি মেরে, দেখে নিতে শেখে

দেহহীন— অগণিত চোখের সাম্রাজ্য গড়ো
সব চোখই উঁকি মেরে দেখতে শিখুক!
এত দৃশ্য জমে আছে— এত ষড়যন্ত্রশোভা;
তুলনায়, উঁকি-মারা-চোখ খুবই কম

দূরত্ব অক্ষুন্ন রাখো। উঁকি মারো:
মেঘের উপরে মেঘ, তারও উপরে— ধু-ধু মেঘ

নিচে,
নিষ্ফলা বন্ধ্যা জমি— দিগন্তবিস্তারী ঊষরতা

অস্তিত্ববোধ

একবার, মাঠের নির্জন থেকে, আচানক এক বাতাস
আমাকে একটানে তুলে নিলো— মহাশূন্যতায়

আনুভূমিক সেই আকস্মিক গতির চক্রান্তে
মাথা ঠেকে গেলো— আসমানে। কী আশ্চর্য
ঊর্ধমণ্ডলে, বলতে গেলে, আর কোনও
শূন্যস্থান নাই। কাচা নীলরং দখল করেছে
তার অলিগলি। চুলে, মাথায়, সমগ্র শরীরে
মেখে গেলো: রঙের সন্ত্রাস

নিম্নমণ্ডলে তাকিয়ে দেখলাম: শুধুই রাজাদের সম্পদ
জনতার কোনও নামনিশানা নাই। অতিবেগুনি রশ্মির
একটা ফিতার ভিতর দিয়ে, তিরতির বয়ে যাচ্ছে— সময়
অতীত ও উড়ন্ত বোরাকগুলোও গাঢ়নীল

নীলের আতিশয্যে, কালো বিন্দুতে পরিণত হতে হতে,
অবতীর্ণ কেতাবের অক্ষরমালায় লীন হলো আমার অস্তিত্ব

এয়ার মেইল

দূরে আছো। থাকো। শুধু মনে রাখো:
আমরা টানছি ঘানি—
ভালো থেকো; আর লিখো: ভরসার
দুটো বা চারটে বাণী

শরীরে শরীরে মেঘ জমে ধীরে
ঝরে তো কেবল— লালই;
বলছি না— আসো, খুব ভালোবাসো;
আজকে কিংবা কালই!

মনপরবাসে কেউ কাছে আসে?
কেউ কি গো বাসে ভালো?

আমরা জটিল উচাটন দীল
রাত্রি-নিশীথে আলো
বলদের মতো কোটি লাখ শত
জ্বালিয়ে রাখছি— নেবে?

যদি ফেরো দেশে আলুথালু কেশে—
এইটুকু কথা ভেবে
কলুর বলদ আলেয়ার হ্রদ
পান করি ঢোকে ঢোকে

তুমি রূপকথা, বিরল বারতা
দামিনী সর্বলোকে

জীবন পরম্পরা

ওইসব দিনের কথা মনে পড়ছে— যখন
আমাদের পূর্বপুরুষগণ বাস করতেন গোত্রজীবনে;
সূর্যোদয়ের আগেই হত্যা করা হয়েছিলো তাদের
আর শেষকৃত্য করবার জন্য বেঁচে ছিলো
সামান্য যে কজন, তারাও আহত, কাতরাচ্ছিলো—

খুনিরা বললো, ‘‘স্বয়ং সমাহিত হও!’’

কিন্তু আজ যখন খুনিরাই সমাহিত করছে আমাদের,
পুঁতে দিচ্ছে— মাটির অভ্যন্তরে; ওরা বুঝতেই পারছে না:
পৃথিবীর ঘড়িতে এখন— জীবন পরম্পরা; আর আমরা হলাম
একেকটা জেদি বীজ, যারা রপ্ত করেছে অঙ্কুরোদগম কৌশল—

দিনপঞ্জী

এখানে, বহুকাল এমন ঘটছে যে
একেকটা দিন এসে, আছড়ে পড়ছে— আর, সন্ধ্যার আদল নিয়ে
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকছে— স্তম্ভিত, নিথর। এই হলো: সমুদয় দিনের পরিণতি

খনিজমলের মধ্যে মিশে আছে
হেম; এখনই তো আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশন করে নিতে হবে
আকাশ-লালিমা থেকে খুলে নিতে হবে— আগুনের আসন্ন পয়গাম
অন্যায্যের আদি হয়ে হেসে উঠছে পিত্তশূল, পুরাতন ও গলিত গ্যাংরিন
আজ তাকে দাহ করে, আবার ফোটাতে হবে: ফুলের আগুন

পিচ্ছিল অন্ধকারে মিশে আছে— নবীন অথচ স্তব্ধ দিন
এখনই তো সন্ধ্যার আকরিক থেকে, খুঁটে খুঁটে, নিষ্কাশন করে নিতে হবে
দ্যুতিময় দিনের সূচনা! তা না হলে, ইতিহাস চিরস্থায়ী সমাধিক্ষেত্রের দিকে যাবে
সুবিধাবাদের মধ্যে জন্ম নিলো: অগণিত দনুর সন্তান

তবু দেখো, খনিজমলের মধ্যে গোপন ও সুপ্ত সুষমা—
এখনই তো আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশন করে নিতে হবে

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com