শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:১৯ অপরাহ্ন

রেজাউল করিম রনির কবিতা

রেজাউল করিম রনির কবিতা

রেজাইল করিম রনি - জবান সম্পাদক - আগুয়ান ওয়েবম্যাগ - কবিতা - poem - agooan - rezaul karim rony - joban editor - kobita

শহর ও স্বপ্ন-বাজারী


শহর মানে অনেকের কাছে অনেক কিছু
আমি দেখেছি,
শহর মানে প্রচুর মানুষ কিন্তু ব্যাপক নিঃসঙ্গতা।
শহরে স্বপ্নের চেয়ে বাস্তবতা বড়
তবুও স্বপ্ন বিক্রি করতে এখানে আসেন অনেক মানুষ।
তুমি তোমার স্বপ্নের মতো হতে চাইলে
ওরা তোমাকে তাদের বাজারের মতো করে ছাড়বে
আর তুমি ওদের বাজারের উপযোগি হয়ে উঠলে
তুমিই হয়ে উঠবে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন।
এই ভাবেই ছদ্দ সত্যে ছয়লাব হতে থাকে বাজার
এখানে উন্নয়ন মানে আত্মধ্বংসের প্রতিযোগিতা,
নিজেকে নিজে ধর্ষণের পরে শুরু করে প্রেমের প্রার্থনা।
তুমি সফল হলে তোমার কষ্টের গল্পগুলাও বাজার পাবে…
সফলতা ছাড়া কষ্টের আর কোন দরদী নাই, উৎযাপন নাই,
কষ্টকে নেয় না আর কোন কষ্টও।
শহরকে ধারণ করে না কোন শহর।

আশ্রয়

নীরবতায় যার আশ্রয় জুটেনি
দুনিয়ায় শব্দের কোলাহলে নষ্ট হয় ধ্যানের মন।
এপিটাফে লেখার মতো বাক্য খুঁজে খুঁজে
নষ্ট করে পাণ্ডুলিপির শব্দাতীত নৈঃশব্দ।
দুইটা দুঃখী মন একজন অপর জনকে অভাগা ভাবছে
এই ভাবে মানুষ চিরদিন গাছ দেখে দেখে বড় হয়।
শব্দ, বাক্য, পুস্তক ও বিদ্যার ভারে ভরে উঠে যার যার ভিটা
দেখে মানুষ, দেখে প্রাণী আরও আরও অদেখাকে দেখার আকুতি থাকে।
তারায় ছেয়ে যাওয়া আকাশ দেখেও বুঝতে পারে না
এই বিশাল আকাশ থাকে না আকাশে আকাশে।
আকাশ মানে মনের স্বপ্ন, এমন স্বপ্ন-সংগ্রামেই আকাশ কাছে আসে
মানুষ মূলত নিজের অসহায় মুহূর্তের ভয়ে ভীত থেকেও অপর বিলাশী।
কে আর মানবে এখন আসলে গাছ মানে জীবন-স্বভাব।
ফলে নীরবতা ছাড়া আমাদের আর কোন আশ্রয় নাই।

সুখি হও

আসমান ও জমিনের মাঝে সব কিছু বিষাদে পূর্ণ হয়ে গেলেও
-তুমি সুখি হও।
সুখ, তবে সুখের মতো সুখ খুঁজে না পেলেও-
আমাদের মনে গজিয়ে ওঠা সুখের ধারণার মতো সুখ নিয়ে হলেও
-তুমি সুখি হও।
কষ্ট ও ক্রোধের লড়াইয়ে ভালোবাসা ভরা মন ক্লান্ত হলে,
আয়ুর অভিজ্ঞতায় বাস্তবের বিষয় ও বসানাগুলা ক্রমে মূল্যহীন মনে হয়,
পানি রংয়ের দুঃখ ধুয়ে, ভুল হিসেবের খতিয়ান ভুলে,আত্মভোলা ছলে
-তুমি সুখি হও।
আমাদের আছে শরীর, আছে অগনন সন্ত্রাসের ভাষা- দুনিয়াতে,
অসহায় শরীরকে তোমার সন্ত্রাসের ক্ষেত্র করে দিয়ে-
রক্তহাসি হাসতে হাসতে বলি
-তুমি সুখি হও।
সুখের মতো সুখ -সে তো থাকে আজ আমাদের সুখের ধারণার বাইরে
এইসব সুখ ভাবনা ও আমার কান্নাভরা ফরিয়াদের পরেও অবশেষে
তুমি যদি না হও সুখি তোমার মতো -হে বিষাদময়ী,
আবেগের আঘাতে নিহত হওয়ার আগে সুখ সত্য নয় জেনেও,
তোমার সুখ চাওয়ার সুখ -মনে নিয়ে পারি দেয়া যায়
সুখ কাতরাতাহীন বৃষ্টিভরা বিরহী বসন্ত।
আমার এই আত্মধ্বংসী দুঃখহীন দুঃখের দিকে চেয়ে হলেও
-তুমি সুখি হও।
সব খুনের চিহ্ন আড়াল করে হাসি হাসি মুখে বলি, মরে যাওয়ার আগে
তোমার ধারণার মতো সুখের চিহ্ন ধরে-
যত বিষাদ জমেছে তার রেখা ধরে ধরে সুখের মতো সুখের পৃথিবী
চিনে নিতে চাওয়ার অসহ্য কষ্ট মেনে নিয়ে হলেও
-তুমি সুখি হও।

অনন্ত ডাক

এইসব বিরহী বাতাসের বেগ শান্ত হয়ে এলে
কেউ কেউ বুঝতে পারেন-
প্রেম মূলত এক অন্তহীন মহানুভবতার পরীক্ষা
-যেই পাঠশালাতে ভালোবাসা নিজেই
একই সাথে গুরু এবং শিষ্য।
এই ভাবে সমগ্রের উপর আপন সত্তা দাঁড়ালে
-সত্যের ডাক ক্রমে শুনতে পাওয়া যায়।

দুপুর-বৃষ্টি

জল ও জীবনের মাঝে যতটা খুন লেগে থাকে
তাই কি আমাদের বাস্তবতাকে নির্মাণ করে?
এইসব হাওয়া ও জলের তুমুল বেদনাভরা উচ্ছাস নয়,
ধুয়ে যাও খুন-ধরা ছদ্দ বাস্তব,
আমাদের জীবনের আঢ়াড়ে আনন্দ ধুয়ে
আমাদেরকে দাঁড় করাও আরও এক নতুন পৃথিবীর
বাস্তবতা নির্মানের কারিগর হিসেবে।
দিনের সময়গুলোর মধ্যে দুপুরই সবচেয়ে অসহায়
-সব সময় সময়ের দ্বিধার জ্বালায় জ্বলতে থাকে।
দুপুরের বৃষ্টিতে দহন বাস্তবতা ধুয়ে, স্বপ্ন-গোসলে-
মাটিগন্ধের সাথে ফুলগন্ধের নীরব মিলনের মতো
-এক কোমল মায়ামোহিন বাস্তবতা নির্মানের
প্রার্থনাতে মেতে উঠো সকল বাস্তবের জননী হে- জীবন।
এভাবে বৃষ্টিতে মিশে গেলে বিষাদ
প্রশান্তি আরও শান্ত হয়ে ঝিরিঝিরি সুর তুলে বাজতে থাকে।

অমরত্ব অথবা কষ্টের চেয়ে সুন্দর

রিদয় ভরা রোদন লুকায়ে
কিছু মানুষ হয়ে আছে- ফুলস্বভাবী।
মৃত্যু-বর্ষের বর্ষায় চোখে খরার খা খা,
আর মনে মেঘভাঙা তুফান।
কেউ জানে না ফুলের প্রতি সভ্যতার কতো কতো ভুল
ফলে তোমার সব নীরবতা
-আজও কেবল রহস্যের জন্ম দেয়।
কান্নাধরা, আবেগঘন কষ্টভরা
ঢোকগুলো গিলে গিলে চোখের জল সামলে নিয়ে-
হাসতে চাওয়া মানুষগুলো
-তাদের কষ্টের চেয়ে বেশি সুন্দর।
ভাষা, স্বপ্ন-আশা ও আবেগভরা ভাষ্যের বাইরে
আমাদের শব্দ যতটা নীরবতাকে ধরতে পারে-
ততটাই অমর-অজর-অক্ষয় হয়ে রয়,
আর এইসব বোবা গান হয়ে মিশতে থাকে বাতাসের ভুবনে।
এভাবে তোমার নীরব বিষাদ-
সুন্দরকে কোন অর্থ না দিলেও ভাষা দেয় ক্রমাগত,
আর ভাষায় যা ধরে না, সেখানে জন্ম হয় অনন্ত রহস্যের,
বিষাদ আড়াল করে করে মুচকি হাসির রেখায় গড়িয়ে গড়িয়ে পরে
অতি অযত্মে বেখেয়ালে বেড়ে ওঠা অতৃপ্ত অমরত্ব।

বৃষ্টি ২০২০

মেঘের দুনিয়ায় কোন সংবাদ না রটলেও
আমাদের দুনিয়ায় পৌঁছে- মেঘ ফাটা, উল্লাস-কষ্ট-আনন্দ,
নিমগ্নতা, একঘেয়েমি, তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘুমহীন ঝিম ঝিম
ঝুম ঝুম
…বৃষ্টি।
আজও মানুষের মন মিশে থাকে বাস্তবের বিষে-
ধুয়ে যায়- ক্লান্ত ধুলার অবসাদ,
বোবার গানের মতো সুর হয় চারপাশে,
অনেক অনেক কথা একটি ধ্বনিতে মিশে যায়
ঝুম ঝুম
…বৃষ্টি।
বৃক্ষস্নানের রেওয়াজ নাই আমাদের জগতে,
কেউ লেখে না সেই গান। কিন্তু গাওয়া হয় নিপুণ ছন্দে, সুরে।
পাতায় পাতায় ভেজা ভেজা আদর
কখনও অবিরাম কখনও বিরাম
ঝুম ঝুম
…বৃষ্টি।
মৃত্যু নয়, জীবনকে সবচেয়ে বেশি চিনেন সংগ্রাম,
জল ও কষ্টের নিগূঢ় সম্পর্কের মাঝে ভাষা চিরদিন অসহায়।
তোমার না থাকায় কতোটা থাকো,
আর থেকে কতোটা হারাও
-এই ভাবে অস্তিত্বের অবসাদ ছুঁয়ে দেখার মতো ভালোবাসার কথা
ভাবতে ভাবতে-
জল-জীবন-স্বপ্ন-সংকল্প
অপরূপ সুরে বাজতে থাকে
ঝুম ঝুম
…বৃষ্টি।

বাতাসের চিঠি

এই সময়…
এমন বিষন্ন বাতাস বয়
এই বিকাল আমার নয়…
অসহায় সবুজ পাতাকেও উদভ্রান্ত মনে হয়
কথার বাহিরে-ভেতরে আরও অনেক কথা রয়।
হিম বাতাস আমারে-তোমারে কি যেন কয়…
ঝড়ের আগে থমকে থাকে সময়।
এই বৈকালী বাতাস মায়াময়…
নীরবে কাঁদে অবুঝ রিদয়
-আবেগে কন্ঠ বোবা হয়।
বাতাসে তোমার চুলের খুশবু ছড়িয়ে যায়
সবকিছু ভরে ওঠে এক বিরহ-ভরা মায়ায়…
এই প্রাণ, এই প্রেম কাছে গেলে দূরে, আর দূরে গেলে কাছে রয়
-এমন মনে হয়,
এইভাবে বিষন্ন বাতাস বয়।

সাবাশ সাবাশ


“চারদিকে লাশ তবু- ইতিহাস উল্লাস
সাবাশ সাবাশ।
উন্নয়নভেল্কি – আছে আনন্দ উচ্ছাস
সাবাশ সাবাশ।
বিপন্ন বিপ্লবের পরে অভিজাত বামাঞ্চলে -হায় হুতাশ
সাবাশ সাবাশ।
নেতা-নেত্রীর রক্তহাসিতে কাঁপে দিন – কামলার সর্বনাশ
সাবাশ সাবাশ।
অন্তরে অবিশ্বাস তবু -এক সাথে বসবাস
সাবাশ সাবাশ।”

শরীর

আমরা শরীর নিয়ে ভাবি,
নিজের শরীর, সবার আাছে শরীর।
আদম বা আদিম টানে মানুষের সঙ্গি থাকে,
নারীর অঙ্গিনায়,আশ্রয়েই পুরুষ
আরও পুরুষ হয়ে উঠলে তখন তা-
তোমাকে আনন্দিত ও হতাশ করে অবশেষে।
মানুষ নিজেকে, অপরকে, প্রেমীকে, শত্রুকে, বন্ধুকে
এভাবে মানুষকে দেখার বদলে দেখে- শরীর।
সম্পদ, গাড়ী, চাবিগুচ্ছ, অর্থটানা কার্ড, স্থান, নাম. নাম্বার
সব কিছু মানুষ সংরক্ষণ করে,
তালাবদ্ধ বা নিজের একটা দখলী নিরাপত্তায় রাখে-
কোন কোন নিয়মের মধ্যদিয়ে
একই ভাবে-
সংরক্ষণ, ব্যবহার ও সংযমের ভারসাম্যে টিকিয়ে রাখে
-শরীর।
বাজার-বাণিজ্য-নন্দন,
শরীর কে ঘিরে তৈরি হয় আমাদের
আশা-হতাশা,
আগুন ও মাটির উপমায় লিখা হয় কত বাক্য ও কাব্য
আর ত্বকের পৃষ্ঠায় আয়ুর গণিত মিলাতে থাকে- শরীর।
জীবনের কোন না কোন সময়ে
শরীরকে আমাদের অসহ্য মনে হয়
শরীরকে ঘরে গর্বঘোর কেটে যায় প্রবল রাগে
শরীর কেটে, ছিড়ে – হতাশাকে শান্ত করতে করতে
-আমাদের অন্য কোন রকম মনুষ হতে ইচ্ছে করে।
নারীর শরীর, পুরুষের শরীর
অস্তিত্বান্ধ মানুষেরও আছে শরীর,
ফলনদার বৃক্ষের মতোন নরীর স্তনভারে সমৃদ্ধ
শরীরকে ঘিরে পুরষের উচ্ছাস ও জন্মঘোর জাগে,
সময়ের দমে সচল পৌরুষ- নারীর শরীরকে
আপন করতে করতে- একে অপরকে পর করে দেয়।
তারপরও জন্মকৃয়ার সুখ, সঙ্গির শরীরকে নিজের আর
নিজের শরীরকে সঙ্গির -এই সরল নিশ্চিন্তে একে অপরের
জন্য ভান ও ভাবনাতে জিবন পার করতে করতে দেখি-
শরীর তো শরীরের নয়।
আমি যেমন আমার নই।
আমাদের শরীর যখন কেবল মাত্র একটি শরীর হতে
প্রবল ভাবে অস্বীকার করে তখনই আমাদের মনে হয়-
এই মরার শরীর ঘেরা মানুষটা আমি নই,
আমি থাকি অন্যকোন খানে।

ভালো নেই

রিদয়ের ঘরে উঁকি দিয়ে জেনে গেছি বিনা সংবাদেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
স্বল্পস্থায়ী বসন্ত চলে যায় রিদয়ের ক্ষত সারার আগেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
তুষারবৃষ্টিতে জমে থাকা বাসি বরফের পরেও হিমশীতলতা নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
মিছিল শেষে পথে পড়ে থাকা জুতাগুলোর ফিতা নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
প্রবল প্রেম-ঝড়ের পরে আমার-তোমার আর দেখা নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
ক্লান্তিহীন কথার চাপেও হূদয়ানুভূতির আগুন থেমে নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
তুষাগুনের মিষ্টি তেজের মতো নীরব আগুন আছে দুটি হূদয়েই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
ধুলায় ছেয়েছে জীবন- পথজুড়ে রক্তের দাগ শুকাবার আগেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
রিদয়ে রিদয় রেখে বলা না বলা প্রতিশ্রুতিদের ঘুম নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
চাঁদ ও তারার পাহারায় রাতের কাজল-চোখে জোছনার ঢেউ নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
সময় ও ভূগোলের ব্যবধানে হৃদযমুনার জোয়ার থেমে নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
আকাশজুড়ে মেঘ আর কাকের হাউ-কাউয়ে চাতকের ঘুম নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
সব কষ্ট গীতল হয়ে অবিরাম কান্না প্রবাহের পরে চোখে পানি নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
এই সময় আর যাপনের ভিতরে স্বপ্নের আলোড়ন নেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
বহু দূর দেশের প্রমময়ী হে- আমরা আছি জীবন শ্বাসের কাছেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।
আমাদের জীবনের ভালোগুলো এখন আর ভালো নেই
তুমি আর আমি দূরে দূরে পুড়ি একই আগুনেই
-তুমি ভালো নেই, আমিও ভালো নেই।

শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com