বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন

শাহিন চাষী’র একগুচ্ছ কবিতা

শাহিন চাষী’র একগুচ্ছ কবিতা

আগুয়ান ওয়েবম্যাগ - Agooan webmag

ছন্দপতন

একদিন একা ছিলাম
অথচ একাকীত্বে ভাসিনি কল্পেও কোনদিন।

সেদিন সারাক্ষণ
আমার সাথে কথা বলতো আকাশ,
আমার সাথে খেলতো ডানপিটে বাতাস;
পাখিদের গানে
কিংবা তারাদের অভিমানে
চোখের পাতায় রঙিন স্বপ্ন উচ্ছল জোনাকি।

সেদিন নীরবে
আমার সঙ্গে হেঁটেছে চাঁদ,
আবীর মুছেছে শ্যাওলাময় অবসাদ;
বিমূর্ত পাহাড় দেখে
অথবা ফুলেদের সুরভি মেখে
জীবন এক বাঁধাহীন ঘাসফড়িং, প্রজাপতি..

সেদিন মমতায়
বৃষ্টি ধুয়েছে বুকের সব ব্যথা,
ঝর্না ভেঙেছে হৃদয়ের স্থির নীরবতা;
জলধির নৃত্যকলায়
আর ঘাসেদের ভালবাসায়
কালের পটে শান্ত পৃথিবী- অপূর্ব জলছবি।

তুমি এলে
আমি ভুললাম নীল আকাশ,
আমি ভুললাম প্রজাপতি, ফুল, ঘাস.. ;
পাখিরা ভুলে গেল,
বাকি সব ছেড়ে গেল, দৃরে গেল
মনের ভেতরে যন্ত্রণা– নিভৃত পিপীলিকা।

আজকে দূরে তুমি
কিন্তু আমি আর ঠিক একা নই,
তবুও একাকীত্বে হৃদয় ভাঙে, হৃদয় জ্বলে…

লক ডাউনের ফাঁদে

: ব্যস্ত তুমি?
কয়টা কথা ছিলো!

: কী কথা! বলো।

: ভালোলাগে না আর–
এই বদ্ধ ঘর, আবদ্ধ জীবন…
মনে সমবেত– বিষাদ, হতাশা, দীর্ঘশ্বাস…

: প্রতীক্ষা করো।
পৃথিবীর অসুখ, শঙ্কিত কাল…
বিষন্ন নদী, রুগ্ন পাহাড়, মেঘলা আকাশ…

: হোক রুগ্ন কাল,
থাকুক মেঘলা ঐ আকাশ;
চলো ঘুরে আসি দূরে কোথাও,
বড় বিষময় এই স্যাঁতসেতে বর্ণহীন দিন!

: কী করে আসি বলো!
মাথার উপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা,
পথে- পথে বাধা, ভয়, দুর্দশা অন্তহীন।

: অফিস ছুটি?
তুমিও কী আটকা বদ্ধ ঘরে?
বেশ বিশ্রামে, বেশ আরামেই আছো তবে!

: অফিস খোলা।
গলায় ঝুলিয়ে যথাযথ পরিচিতি
নিয়ম মেনেই কেবল অফিসেই যেতে হবে।

: অফিসের পর?
চলে এসো অফিস শেষে, একবার;
ডাকছে দিগন্ত, ডাকছে পাহাড়,
ডাকে জ্যোৎস্না, নদী বারবার, বারেবার!

: যদি সম্ভব হতো
নিশ্চয় হাঁটতাম আঙুল ধরে;
বসতাম মুখোমুখি স্বপ্নের জলসা ঘরে।
কিন্তু সাজা ভয়ানক– আইন অমান্যতার!

: হা, হা, হা…
বিপণি খোলা, রেস্তোরা খোলা,
জল খোলা, স্থল খোলা, আকাশ খোলা…
শুধু নাগরিক পায়ে তালা!– সাবাস!

: ওভাবে বলো না!
স্পষ্টবাদী রাষ্ট্রের সতীন,
স্বজন তার খচ্চর, ছাগল, গাধা…
নিন্দে করো না এতটুকুন– একদম,
রাষ্ট্র শুনলেই সর্বনাশ– ভয়ানক সর্বনাশ!

আলোর ঝলক


উৎসর্গ: ড. আসিফ মাহমুদ

আমার ধূসর মাঠে
সজীব সবুজের সুনির্মল হাসি, সুরেলা কণ্ঠস্বর…
বুকের গহীন ভেতর জ্যোৎস্নার গীতিনাট্য।

ভলগার তীরে বসে
মিসিসিপির সুরে অনেক শুনেছি টেমস’র গান!
অবারিত আকাশে বৃষ্টির মেঘমালা;
আমি শুনছি পদ্মার কলরোল,
আমি দেখছি তিস্তা, তিতাস, ধলেশ্বরী…
কারুময়-চারুময়-উপল নৃত্যকন্যা।

অনেকটা সময় গেছে–
চেরির শাখা পাশে ইউক্যালিকটাস খুঁজে-খুঁজে!
বাতাসের ডানায় আজ নতুন পালক;
আমি শুনি জারুল- অতসীর হাসি,
আমি দেখি বকুল, আকন্দ, কলমি, ভাঁট…
আড্ডায় আসরে কিশোরী, যুবতী..

অবাক- আশ্চর্য মোহে
রাতদিন উষ্ণ সখ্যতায় ইমু, হাড়গিলে, ফিনিক্স…
সোনার মাটিতে মুখস্থ ঘ্রাণের লিরিক;
কাছে বা দূরে দোয়েলের শিস,
এখানে- সেখানে শালিক, মাছরাঙা, টিয়া…
স্বজনসভাতে প্রাণখোলা, উচ্ছল।

আমার উঠোনে, ঘরে
জ্যোতির্ময় নক্ষত্রের শৈল্পিক মুখ, দৃপ্ত পদধ্বনি…
আমি দেখছি মৌনতার ব্যাকরণে–
চারিদিক আলোর জোনাকি উন্মাদ- উন্মাদিনী।

কাব্যরাগ

মিস্ত্রীহাতে
একান্ত মনে চুপচাপ
আমি তোমার মায়াময় মুখটা আঁকি–
ভালবাসার উজ্জ্বল রঙে,
নরম সোহাগের কোমল রেখায়_

তারপর–
খোঁপাতে রূপকের ফুল,
প্রশস্ত কপাল পরে শব্দের টিপ,
দুইটি কানে বাণীর ঝুমকো,
কল্পিত কলার নোলক, বিছা, কাঁকন…

তারপর–
সাগর দোলানো চঞ্চল চোখে
ছন্দের কাজল বা উপমার মাশকারা_

তারপর–
কমলা কোয়া ঠোঁটের উপর
অনুপ্রাসের ছোঁয়া,
বাস্তবতা কিংবা পরাবাস্তবতার ছায়া,
মিথের রশ্মি, রহস্যের আভা…

তারপর–
পার্থিবতার সাতনরী,
অপার্থিব আলতার আলপনা,
পঙক্তির নকশা কাটা কারুজ শাড়ি,
উৎপ্রেক্ষার অলঙ্কার…

অবশেষে,
অশ্রু ও হাসির মিলিত ধারা:
তোমাকে ছুঁয়ে ভাবনারা
কবিতার বনে প্রজাপতি, ঘাস, ফুল..

পিছনের দৃশ্য
শাহিন চাষী

বিনিদ্র চোখ;
খোলা জানালা;
নিশাচর স্মৃতিরা– আম্বরখান, চৌহাট্টা, জাফলং, হাকালুকি, সুরমা…
ওরা হেঁটে যায়, ভেসে যায়, উড়ে যায়– বাকহীন; রেখে যায় শব্দের ফড়িং, জোনাকি, প্রজাপতি…

হঠাৎ অবসর;
ভাবনার পালে হাওয়া;
বুকের সরোদে– চুলের খেয়াল, ঠোঁটের টম্পা, চোখের ঠুমরি, বুকের পট…
হৃদয় পাতায়– কলাবৃত্ত, দলবৃত্ত, মিশ্রবৃত্ত, পূর্ণযতি, অর্ধযতি, লঘুযতি…

গভীর ঘুম;
উন্মাতাল শিহরণ;
আবেগের দরোজায়– অনুরাগ, অভিমান, খুনসুটি, চুম্বন, আলিঙ্গন…
অনুভব জুড়ে– কষ্টের স্বর, ব্যথার ব্যঞ্জন, হতাশার পয়ার, কান্নার লিরিক…

অবশেষে স্মরণসভা:
ভালোবাসার মাঠ, মমতার চাষ, প্রেমের বীজ– কবিতার প্রজনন।

পদধ্বনি

ঘনঘোর রাত,
অঝোর বৃষ্টি আর দমকা হাওয়ারর ভেতর–
কেবলই অগ্রগামী বিরামহীন পা।

মাথার উপর দিয়ে
তীব্র আওয়াজে শাঁই শাঁই বাজখাই বিমান,
মৃত্তিকায় মুখোমুখি পরমাণু- জীবাণু;
চোখের সামনে ঝলসানো পৃথিবী–
আলোহীন, সবুজহীন, ছন্দহীন, সুরহীন…

পায়ের নীচে নরম:
কালচে রক্তের সাথে অগনিত পচা হৃৎপিণ্ড,
চারিদিক কঙ্কালের বিলাপ- সরগোল;
ফাটলে- ফাটলে জর্জরিত–
রঙিন স্বপ্ন, সজ্জিত সভ্যতা, নীল আকাশ…

হঠাৎ অনুভূত–
বরফকুচির মতো কী যেন ঝরছে অবিশ্রাম,
তার সুবাস ও রঙ– চেনাজানা বেশ!
প্রসারিত বাহুর উন্মুক্ত করতলে–
নীতি, নৈতিকতা, বিবেক, বোধ, মনুষ্যত্ব…

প্রার্থনার মিশ্রিত ধ্বনি.
দৃষ্টিতে স্নিগ্ধ সবুজ, সতেজ ফুল, শান্ত ঢেউ…
কালের মাঠে স্বৈর ঈশ্বর ও সভাসদ!

একবিন্দু অশ্রু দিও

একটা কথা আজ
অদ্ভুত এক উন্মাদনায় লিখে যাচ্ছি কবিতায়
তৃষ্ণা কাতর চাতকের অন্তহীন প্রত্যাশায়!

আমি কবিতাকে ভেবেছি–
আমার যাবতীয় অবসরে, ব্যস্ততায়, প্রার্থনায়;
কবিতা মানে– আমার হাতে তোমার হাত,
তুমি মানেই প্রাণের স্পন্দন:
অবারিত ব্যথার দরিয়ায় সুখের অবগাহন।

আমি কবিতা লিখেছি–
সব কাজ ফেলে, ক্ষুধা ভুলে, ঘুমের উপেক্ষায়!
কবিতা মানে– তোমাকে ভালোবাসা,
তুমি মানেই কারুময় পৃথিবী:
আঁধারের প্রচ্ছদে অশ্রুর দাগে স্বপ্নের ছবি।

আমি কবিতার সাথে খেলি–
ঊষার আঁচলে, দুপুরের বুকে, রাতের ছায়ায়;
কবিতা মানে– অস্তিত্বে তোমার ভাস্কর্য,
তুমি মানেই জীবন উপাখ্যান–
দ্রোহের লিরিকে শুদ্ধস্বরের প্রেমময় গান।

আমি লিখে গেলাম
আমার একান্ত হৃদয়ের স্বর- সুর
কোন অবসরে যদি পারো একবার পড়ে নিও
আর প্রেম না হোক একবিন্দু অশ্রু দিও।

নাটের গুরু

অভ্যাগত সুধীজন!

কেবলএকটা কথা জানাতে ও বলতে এই আয়োজন। হয়তো কালই আমার ছায়া মুছে যাবে; সকল শক্তিধর নিভৃতে ভয়ঙ্কর– মুখোশে অনুক্ষণ স্বৈরাচার গোপন।

অনেক কাঁদলাম, অনেক ভাবলাম আর জানলাম, রক্ত- খুন- ধর্ষণ দেখেও যে মূক, লুটেরা- প্রতারক- মিথ্যুক যে চোখে পড়ে না ধরা– সে আমার আলোর খুনি, দৈন্যের নায়ক, সামন্ত প্রভু; সে-ই আমার অশ্রু ও অন্ধকারের কারণ!

আমি খুঁজে ফিরি– কে সেই নাটের গুরু! আমি তার ছায়া দেখি– চেনার মাঝে অচেনা– আশ্চর্য অভিনেতা, চরম রহস্যময়। চিনেন?– আপনারা চিনেন!– ভীতিহীন করুন মন।

সহসা ভিড়ের ভেতর– ঈশ্বর, ঈশ্বর… মিশ্র রাগের এক অব্যয় গুঞ্জন।

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com