রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৬ অপরাহ্ন

রক্তে ভেজা শব্দ: তাসমিরা ইসলাম আর্নি

রক্তে ভেজা শব্দ: তাসমিরা ইসলাম আর্নি

প্রেমের গল্প বাংলা গল্প আগুয়ান ওয়েবম্যাগ নারীবাদ নারীবাদী গেল্প তাসমিরা ইসলাম আর্ণি agooan webmag love story tasmira islam arny bengali feminist story

১.
এখন আমার ঠিক সামনের সিটে যে লোকটা বসে আছে তাকে চার থাপ্পড় দিলে নিশ্চয় আমাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে না। খুব জোর পাশের মানুষগুলো আমার সাহসী কাজ দেখে অবাক হবে এবং তাদের চোখ কোঁটর থেকে বেরিয়ে আসারা চেষ্টা করবে। আর আমার পাশে বসা ছেলেটি, যে এতোক্ষণে নানানভাবে আমার সাথে লুতুপুতু কথা বলে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করছে সেও ভয়ে চুপসে যাবে। ঠিক বাতাস ভর্তি বেলুনে সুঁই ফুটিয়ে দিলে বেলুন যেমন চুপসে যায়। সামনের সিটে বসা লোকটার অপরাধ হলো এই যে তিনি বাসের মধ্যে সিগারেট ফুঁকছেন। বাইরে হালকা বাতাস হচ্ছে। তাতে ভেসে আসা শুদ্ধ অক্সিজেন নেওয়ার চেষ্টা করতেই সিগারেটের দূর্গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। অথচ, আমি বেঁচে থাকবো বলেই এখন আমি এখানে। কিন্তু এই লোক যখনি সিগারেটে টান দিচ্ছে আর ভোঁসভোঁস করে ধোঁয়া ছাড়ছে তখন তার গন্ধে মনে হচ্ছে এই বুঝি মরে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আমি নিশ্চুপে সব সইয়ে গেলাম। সাহস দেখাতে পারলাম না। আমাকে সাহস দেখানোর অধিকার এই সমাজ দেয়নি। কারণ, আমি মেয়ে মানুষ, পুরুষ নই।


২.
সকালে বাসায় না বলে বের হয়েছি বাসায় ফিরবো না বলে।অদ্ভূত বাবা আমার গায়ে হাত তুললেন। সে কোথাকার কে আমার নামে চিঠি লিখে ফেলে গেছে দরজায় কে জানে! আর এখন দোষ সব আমার ঘাড়ে। এদিকে আমি এর কিছুই জানি না। কিন্তু ওই যে, চিঠি আমার নামে এসেছে। ব্যাস বাবার একই কথা, আমি নাকি তাদের সম্মান নষ্ট করছি। রাগটা চরমদশায় রূপ নিলো। বেরিয়ে এলাম বাসা থেকে।থাকো তোমরা তোমাদের সম্মান নিয়ে।


৩.
আমি যাচ্ছি গাজীপুর। সুদীপ্ত সেখানেই থাকে। সুদীপ্তের সাথে আমার সম্পর্কের বছর দেড়েক হয়েছে। বেশ নম্র-ভদ্র মানুষটা। লেখালেখি করে কিনা। লেখার হাত ভালো বলে কিছু কবিতার বইও ছাপিয়েছে।একটি বই এ আমায় নিয়ে একটি কবিতা ছিলো।
“মৃন্ময়ী তুমি দূরেই থেকো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখো না’
শ্মশানঘাটে তোমার ওই পবিত্র পা রেখো না”।
ঘর-পরিবার ছেড়ে আসা আমাকে সুদীপ্ত ভালোবেসেছিলো। রাতজেগে ভালোবেসে ভোরে ক্লান্তি নিয়ে ঘুমোত। ততদিনে দেহের প্রতিটা লোমকূপে তার দেয়া ভালোবাসা নামক যন্ত্রণা। হ্যাঁ যন্ত্রণা! সে আমাকে কামড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে প্রতিটা রাত।পুরো দেহে এখানে সেখানে তার দেয়া ক্ষতের দাগ। চোখে কাজল দেয়ার আর প্রয়োজন নেই। রাত্রিজেগে চোখ আমার কাজলকালো। সে বললো বুকে কাপড় সড়িয়ে ফেলো, কবিতা লিখবো। আমি তার কথায় আঁতকে উঠলাম। তার ভালোবাসা নামক জাল থেকে পালিয়ে আসার ব্যর্থ প্রচেষ্টাও কম করিনি। কিন্তু আমি পারিনি তার শক্তির সাথে। বিছানায় হাত পা বেঁধে নগ্ন করে ছুঁড়ি দিয়ে বুকের ভাঁজে লিখে দিলো কবিতার দু খানা লাইন!
“আমার ভালোবাসার যন্ত্রণা তোমার বুকে রেখো,
রক্তশূন্য দেহেও ভালোবাসা এঁকে যাবো।”


সুদীপ্ত আমার দেহে ভালোবাসা নামক যন্ত্রণা আঁকার খেলায় মেতে উঠেছিলো। নাহ! আমি আর পারলাম না। একদিন সে গোসলখানায়। বালতির পানি অর্ধেক। রান্নাঘর থেকে ছুড়ি নিয়ে এসে তার গলা বরাবর বসিয়ে দিলাম। ফিনকি দিয়ে তার রক্ত গিয়ে বালতির পানি ততক্ষণে লাল হতে শুরু করেছে। আমার হাতে লেগে গেলো একটি পিশাচের রক্ত। আমার হাত হয়ে উঠলো অভিশপ্ত। আমি মেয়ে মানুষ থেকে হয়তো মানুষ হয়ে উঠার চেষ্টায় বেরিয়ে এলাম সেই রক্ষপুর থেকে। যতক্ষণে তার শরীর রক্তশূন্য ততক্ষণ আমি দৌঁড়ে তিন গলি পেরিয়ে এসেছি।

৪.
বাসায় কোনো বিয়ের প্রস্তাব এলেই বাবা সরাসরি বলে দেন তিনি মেয়েকে ছাড়া থাকতে পারবেন না।যেদিন মেয়েকে ছাড়া থাকার সাহস জুঁটাতে পারবেন সেদিন বিয়ের কথা ভেবে দেখবেন। বাবা বুঝেছিলেন আমি ততদিনে মৃত। ঘর-সংসার তো অনেক দূরের ব্যাপাাস্যাপার, আমার যে নিঃশ্বাস চলছে এটাই আশ্চর্যের কম কিছু না। রাত ২:৩৫। ফোনের রিংটোনে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। প্রাইভেট নাম্বার। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কন্ঠটা বলে উঠল, “বুকে আবারও ভালোবাসা আঁকতে চাই।” ভয়ে কুঁকড়ে উঠলাম। ছুঁড়ে ফেলে দিলাম ফোন। অন্ধকারেও শব্দে বোঝা গেলো ফোনের দু’তিন টুকরা হয়েছে। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। সকালে ঘুম ভাঙ্গলো ভাইয়ার চেঁচামেচিতে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি ভাইয়ার কথা। “আমার টেবিলে একটা সিগারেট ভর্তি প্যাকেট ছিলো। হারালো কোথায়? ” ঠিক তখনি আমি বালিশের পাশে থাকা গোল্ডলিফের প্যাকেট থেকে একটায় আগুন ধরিয়ে চোখ বন্ধ করে লম্বা টান দিলাম। সেই লোকটির চেহারার আদোল চোখে ভেঁসে উঠলো। সেই যে বাসা থেকে পালিয়ে যাবার দিনে বাসের সামনের সিটে বসে ভোঁসভোঁস করে ধোঁয়া ছাড়ছিলো। ঠিক আমি এখন যেমনটা করি।


শেযার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
You cannot copy content of this page