বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন

ডলি মনিরের গল্প: বুড়ি

ডলি মনিরের গল্প: বুড়ি

ঘরের এক কোণে তৌহীদের মা কোঁকাচ্ছে, বাবা তৌহিদ কই গেলি,একটু পানি দে বাবা।
পনেরো বছরের জবেদা, তৌহিদের মেয়ে ধমক দিয়ে উঠে, অই বুড়ি চিল্লাও কেন ? তোমার জ্বালায় ঘরে থাকতে পারমু না । এ কথা বলে বেরিয়ে যায় সে।

ছোট মুদি দোকানের দোকানদার চার ছেলেমেয়ে মা বউ মিলে সাতজনের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিনিয়ত । তৌহিদ ভেবে পায় না তার দোকানটা চলে না কেনো ! কেনোই বা এলাকার লোকেরা তার দোকানটা রেখে দূরের দোকানটায় চলে যায় ! তৌহিদ সবাইকে ডেকে তার ভালো মালগুলো দেখাতে চায় এমন কি প্রয়োজনে বাকি বা কমেও জিনিসপত্র বিক্রি করার প্রতিশ্রুতি দেয় তবু কেউ আসে না, দোকানটার কোনো উন্নতিই হচ্ছে না। অভাব অনটন অভিযোগ, বাচ্চাদের বিরক্তি সবমিলিয়ে জীবনটা তার কাছে মাঝে মাঝে নরক মনে হয়। এ নরকে উনুন জ্বালানোর দ্বায়িত্বটা বউ সইচ্ছায় ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। তৌহিদ রাস্তা থেকে তার বউয়ের চিল্লাচিল্লি শুনে ঘরে এসে চুপ করতে বল্লে দ্বিগুন বেড়ে যায় আগে এ নিয়ে মারামারি হতো, কেউ কাউকে ছাড়তো না , তৌহিদ চুল ধরলে বউ ধরতো শার্টের কলার, এখন এসব করতে তৌহিদের মন চায় না, শরীরও কুলিয়ে উঠে না , তাই বাড়িতে এসে বউয়ের কোনো কথারই উত্তর দেয় না । কিন্তু মায়ের মুখে জড়ানো কথাগুলোর মাঝে মাঝে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে।

তৌহিদের মা পানির জন্য এক জনের পর একজনকে ডেকেই চলছে, কিন্তু কারোই কোন সময় নেই, শুনলেও এড়িয়ে যাচ্ছে।
অনেকক্ষণ পর ছোট নাতি দাদীকে পানি দেয়, নেও, পানি আনছি , মা তোমারে কতা কইতে না করছে।
বুড়ি পানি খেতে খেতে, আল্লাহ্ তোরে ভালো করবো ভাই ।

প্রায় পুরোটা সময় একা থাকতে হয় তাই আগের ঝাপসা স্মৃতিগুলো চোখের কোণে জড়ো করে, ছেলেকে ডাকে, ফিরে যায় পিছনে, অতীতের ছোট ঘরে, তৌহিদকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দিনটার কথা মনে পরে চোখে পানি এসে পড়ে। ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসে, পোলাডা এত তাড়াতাড়ি বড় হইয়া গেলো,ওরে কাছে পাই না, কতা কইতে পারি না। পিছনের স্মৃতি বুড়িকে ঝাপটে ধরে , সেই সময়টা বর্তমান হয়ে যেনো তার সামনে দাঁড়িয়ে । ঘোরের ভেতর থেকে কথা বলতে থাকে, ” তোরে ছাড়া থাকতে পারমু না বাপ, তোর খালার লগে যাইস না ।

কিশোরী বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো, পর পর তিনটা সন্তান মরার পর , সবাই যখন কুলক্ষণা বাজা বলে গালি দিচ্ছিলো তখন কোল আলো করে তৌহিদ এসেছিলো। সারাক্ষণ ছেলেকে বুকে আগলে রাখতো, অনেক রাতে ঘরে ফেরা নেশাখোর স্বামীর হাতের মার খাওয়াও ভুলে যেতো তৌহিদের মুখের দিকে তাকালে , ভুলে যেতো প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা আঘাত অপঘাত, ঘোরের ভেতর ডাকতে থাকে, বাবা মায়ের বুকে আয়, তোরে কতদিন আদর করি না, ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।

দুনিয়ার বিরক্ত নিয়ে তৌহিদ বাসায় ফিরে, বাচ্চাদের চিল্লাচিল্লি দেখে জোরে গালাগাল করতে থাকে, তোদের জন্য আমি সারাদিন খাটি, দুইদিন পর বড় হইয়া আমারে ঘর থিক্কা বাইর কইরা দিবি। অই সজলের মা, সারাদিন কি করো পোলাপাইন সামলাইতে পারো না।

বয়স পয়ত্রিশের তৌহিদের বৌ রাগী চেহারায় সামনে দাঁড়ায়, কি হইছে ? পোলাপাইন জন্ম দিছো, ঝামেলা সহ্য করতা না কেন ? আমিতো তোমার মায়ের ঝামেলাও সহ্য করি।

তৌহিদ বিরক্তি নিয়ে ঘরে চলে যায়, বুড়ি একা একা ডেকেই চলছে বাবা তৌহিদ আয় আমার কাছে আয় বাবা। সারাদিন ডাকাডাকির পর তৌহিদকে কাছে পায়।

মা ডাকো ক্যান? তোমার জন্য সুখমতো চারডা ভাতও খাইতে পারুম না নাকি। কও কি কইবা।

কাছে বইয়া থাক বাবা, আগে তোর মারে ছাড়া তুই থাকতে পারতি না, এহন তোরে ডাইক্কা কাছে পাই না বলেই , বুড়ি ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

ঘ্যানর ঘ্যানর বাদ দিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। সকাল সকাল গঞ্জে যাইতে হইবো, তাড়াতাড়ি ঘুমাইয়া পড়ুম ,এ কথা বলে তৌহিদ চলে যায় ।

বুড়ি কাঁদতেই থাকে, আমার লগে দুইডা কথা কওয়া যাইবো না , এমন পোলা পেডে নিছিলাম, আল্লা আমারে চক্ষে দেহো না কেন। বাছায়া রাইক্ষা আর কত দুখ দিবা।

প্যচাল থামাইয়া খায়া লন, একলা উঠতে পারবেন এ কথা বলে তৌহিদের বউ মাথা শক্ত করে ধরে বসায় , পানি কম খাইয়েন রাইত বিরাত পেসাব কইরা বিছানা ভাসায় রাইখ্খেন না। তৌহিদের বউ ভাতের প্লেট পানি সবকিছু সামনে রাখে।

বুড়ির বাতের রোগ, হাঁটাচলা বন্ধ, বসে বসে মাটি হেঁচড়িয়ে প্রকৃতির কাজ সারতে বাইরে যায়, বেশি ক্ষণ শুয়ে থাকলে ওঠতে কষ্ট হয় তখন বিছানা নোংরা করে ফেলে। বুড়িকে গালাগাল করতে করতে ধোয়ার কাজটা তৌহিদের বউ করে।

ভালা তরকারি দাও , কি দিছো দেইখা বমি লাগতাছে। তোমারে মাছ রানতে দেখলাম এহন পাতে দেহি অন্যকিছু ।

বুড়ির একথা শুনে তৌহিদের বৌ তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। কি কইলেন আমার রান্দা ভালা না , মাছ রাইন্দা আফনেরে দেই নাই, সারাদিন হুইয়া হুইয়া মনের মধ্যে এ শয়তানিই পাকান । বাতাসে বুড়ি অইছেন, আফনের ভিতরের প্যাঁচ এহনো যায় নাই। এ খাওন কুত্তারে খাওয়ামো তবু আফনেরে দিতাম না, তৌহিদের বৌ ফোস ফোস করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

বুড়ি আবারও ফিরে যায় অতীতে, দুরন্ত ছেলের পিছনে ছুটতে থাকে, তৌহিদ বাবা দৌড়াইস না, থাম পইড়া যাবিতো, খেলা থামা বাবা, গোসল করবি ,ভাত খাবি। একনাগারে ডাকতেই থাকে, আয় বাবা, তোর মায়ের কাছে আয়।

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com