সোমবার, ১৩ Jul ২০২০, ০৮:২৫ অপরাহ্ন

ভেনাসের আশির্বাদ: মুহিব্বুল্লাহ আল মাহদী

ভেনাসের আশির্বাদ: মুহিব্বুল্লাহ আল মাহদী

রাজপুত্র এঞ্জেলো ভারাক্রান্ত মনে বাগানে ঘুড়াফেরা করতেছে। মন ভারাক্রান্ত হবার অবশ্য কারন আছে, তার অতি আদরের বিড়ালটা গতরাত থেকে নিখোঁজ। অথচ এটি তার সর্বক্ষণের সঙ্গী।
এঞ্জেলো তার সুখ দুঃখের সব কথাই বিড়ালটির কাছে বলে। বিড়ালটা ও সব সময় ছায়ার মত তার পিছু পিছু ছুটে। রাজবাড়ীর বিড়াল হিসেবে সমাজে এ বিড়ালের কদরটাও আর দশটা প্রাণীর চাইতে বেশি। লিচেনস্টাইনের রাজা ফ্রাঙ্কলিন গ্রীস সফরে আসার সময় উপটৌকনের সাথে বিড়ালের বাচ্চাটি ও এনেছিলেন। যা তিনি ক্রয় করেছিলেন দশ হাজার ফ্রাঙ্কের বিনিময়ে। রাজা ডেভিড তা দেখে হয়ত তেমন একটা খুশি হবার চাইতে মনে মনে অপমান বোধ ও করতে পারেন। কিন্তু রাজপুত্র এঞ্জেলোর আনন্দ দেখে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন।

এঞ্জেলো যদিও বয়সে কচি খোকা না। তবু ও একাকিত্বকে দুর করার জন্য বিড়াল ছানাকে নিয়ে খেলা করত। গত রাতে গীর্জায় গিয়ে দেবী ভেনাসের কাছে কিছু প্রার্থনা করেছিল এঞ্জেলো। ভেনাসের কাছে অবশ্য সবাই একই জিনিস চায়। সে হল মনের মানুষ। গ্রীকদের কাছে দেবী ভেনাস হল ভালবাসার দেবী। এঞ্জেলো ও হয়ত তার মনের মানুষের সন্ধানেই প্রার্থনা করেছিল। তখন ভীরের মধ্যে কোথায় যে বিড়ালটা হাড়িয়ে গেছে সে টেরই পায়নি।

আনমনে এঞ্জেলো বাগানে ঘুড়তেছে। বাগানের দক্ষিণ কোণে দেবী ভেনাসের মুর্তির সামনে গোলাপের ঝুপটা হঠাৎ প্রচন্ড রকম নড়াচড়া করতে লাগলো। এঞ্জেলো অভিভুত হয়ে চেয়ে রইলো ঝুপটার দিকে। পরীর মত একটা মেয়ে ফিরোজিয়া বর্ণের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। সদ্য তোলা গোলাপের পাপড়ি গুলো নাড়াচাড়া করতেছে।

এঞ্জেলো চোখের পলক ফেলতে যেন ভুলে গেছে। পলক ফেলতে যে সময় প্রয়োজন ততটুকু সময়ের জন্য সে এই মায়াময়ীকে না দেখে যেন থাকতে পারবে না। মেয়েটি ও এক পলকে চেয়ে রইলো। মনে হয় যেন তারা শত জনমের আত্মার আত্মীয়কে খুঁজে পেয়েছে। দেখা সাক্ষাৎ পরিচয় এসব কিছু হবার আগেই দুজনের মনে হাড়ানোর ভয় জেগে উঠল। যেন স্বর্গ থেকে এই মাত্র প্রেমিক যুগল ধরায় উড়ে এসে পড়ল। অস্ফুটে দুজনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল-অপুর্ব।

দেবী ভেনাস শূন্যে থেকে হাসির ঝিলিক ছড়াতে লাগলো। এঞ্জেলো দেবী ভেনাসের মুর্তির কাছ থেকে চরন ধুলো নিয়ে মাথায় দিল। দেবী আমার প্রার্থনা তুমি শুনলে? দেবী যেন শূন্য হাতে দুর আকাশে হাত নেড়ে দুজনকে আশির্বাদ করল।
মেয়েটি লজ্জাবতীর মত হঠাৎ চুপসে যেতে লাগলো, যখন এঞ্জেলো ধীর পায়ে তার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো।
প্রশ্ন করল- কে তুমি?
মেয়েটি লাজুক চোখটা নিচে নামিয়ে উত্তর দিল – ভেনাসের দাসী। কিছুক্ষণ নিরব থেকে বলল – নাম মিরান্ডা। ভাগ্যের সন্ধানে ঘুড়তে ঘুড়তে আজ এথেন্সের এই রাজবাড়িতে উপস্থিত হয়েছি।

রাজা ডেভিড রানী কিউবা দু’জনেই মেয়েটিকে দেখে মুগ্ধ। যেন স্বয়ং ভেনাস স্বর্গ থেকে এসে তাদের প্রাসাদে আশ্রয় নিল।

এথেন্সের রাজপথে কুমারী মেয়েরা নৃত্য গীতে মেতে উঠল।

রাজবাড়িতে সাক্ষাৎ পরীর সাথে রাজপুত্র এঞ্জেলোর বিয়ে হবে। সর্বত্রই সাজসাজ রব। গীর্জা গুলোতে আলোকসজ্জা করা হল। দেবী ভেনাস এর মুর্তিকে ফুলের মালা দিয়ে ভরিয়ে দেওয়া হল।

সেনা ছাউনিতে চলতে লাগল অতিরিক্ত প্রস্তুতি। যদি রাজা ফ্রাঙ্কলিন তার মেয়েকে নিয়ে যেতে আসে। যে কোন মূল্যে মিরান্ডাকে রাখতে হবে। এমন চাঁদ মুখ ভুলে এঞ্জেলো বাঁচবে না।

মিরান্ডা নিজেকে লিচেনস্টাইনের রাজকন্যা পরিচয় দিয়েছে। বলেছে – তার বাবা তাকে এক দুশ্চরিত্র লোকের হাতে তুলে দিতে চায়। তাই সে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। রাজা রানী দূজনেই মিরান্ডাকে শান্তনা দিলেন। বললেন – ভয় পেয়ো না। এমন শক্তি পৃথিবীতে নেই যারা রাজা ডেভিড এর কাছ থেকে জোর করে তোমাকে নিয়ে যাবে। সেনাপতি হেক্টরকে বলে রেখেছি। তুমি নির্ভয়ে এ প্রাসাদে থাকবে। বাগানে ঘুরে বেড়াবে। দেবী ভেনাস তোমার সহায়।

পরশু এঞ্জেলো আর মিরান্ডার বিয়ে হবে। বিভিন্ন রাজ্যে রাজার কাছে দাওয়াত দিয়ে দূত পাঠানো হয়েছে। রাজবাড়িতে সপ্তাহ জুড়ে চলছে নৃত্য গীত। চাকর বাকর সবাই সাজগোজ করে ঘুরছে।

সন্ধ্যা বেলা আকাশের চাঁদটা যেন হাসছে। আকাশ পরিষ্কার থাকায় চাঁদের আলোয় বাগানের ফুলগুলো আর ও সুন্দর দেখাতে লাগল। এঞ্জেলো আর মিরান্ডা স্বপ্নাতুর চোখে দুজন দুজনকে দেখতে লাগল। এইতো কাল বাদে পরশু দু’জন দুজনার একান্ত আপন হয়ে যাবে।

দুজনের পরিকল্পনার কথা বলতে বলতে ওরা বাগানের মধ্যে পায়চারি করতেছে। কখনো হাড়িয়ে যায় অতীতের মাযে কখনো ভবিষ্যতে। আবার ফিরে আসে বর্তমানে।

এঞ্জেলো একটা বাহাড়ী ফুলের ডাল ভেঙে উপহার দিতে চাইলো মিরান্ডাকে। অমনি ফুলের মায থেকে লাফিয়ে পড়ল একটা ছোট ইঁদুর। মিরান্ডা বিড়ালের মত মিয়াও শব্দ করে লাফিয়ে পড়ে ইঁদুরের উপর।

এঞ্জেলো অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। ইঁদুরটি নারী মুর্তি ধারন করে দাঁড়িয়ে আছে। স্বয়ং দেবী ভেনাস তার পদতলে মিরান্ডা বিড়ালের রূপ ধরে মিয়াও মিয়াও শব্দ করছে আর ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে এঞ্জেলোর দিকে। কখনো চাইছে দেবী ভেনাসের দিকে।

নিরবতা ভেঙ্গে দেবী ভেনাস বললেন – ভয় পেয়ো না এঞ্জেলো। আমি চিরকাল তোমাদের বংশের প্রতি সহায় ছিলাম, এখনো আছি। এখন যা ঘটেছে তা ও তোমার মঙ্গলের জন্যই।

এই হচ্ছে তোমার হারিয়ে যাওয়া বিড়াল। দেখ এঞ্জেলো ভালবাসার স্রষ্টা স্বয়ং ঈশ্বর। ঈশ্বরের দেওয়া ভালবাসা কেড়ে নেবার অধিকার এই দেবীর নেই। তোমার বিড়াল ছানাটি তোমাকে প্রচন্ড ভালবাসে। তুমি যে রাতে আমার কাছে প্রার্থনা করেছিলে একটা মনের মানুষের জন্য। তখন তোমার বিড়াল ছানাটি ও ফ্যালফ্যাল চোখে আমার দিকে চেয়ে ছিল। তার মনের বাসনা ছিল মানুষ হবার। মানুষ হয়ে তোমাকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পাবার। তার প্রার্থনা আমার ভালো লেগেছিল। তাই তাকে আমি সুন্দর মানবীর আকৃতি দিয়েছিলাম। এবং তাকে একটা শর্ত ও দিয়েছিলাম। সেটা হল বিড়ালের স্বভাব ছেড়ে মানুষের স্বভাব ধরতে হবে। সে তাতে সায় ও দিয়েছিল।

পরশু তোমাদের বিয়ে। তাই ভাবলাম আসলে সে তার স্বভাবটা পাল্টাতে পেরেছে কিনা পরীক্ষা করে দেখি। কিন্তু সে ব্যার্থ হয়েছে। তাই তাকে তার পূর্বের রুপ ফিরিয়ে দিলাম। সব্ই তোমার মঙ্গলের জন্য। তোমরা সুখে থাক।

দেবী ভেনাস শূন্যে মিলিয়ে গেল। নির্বাক এঞ্জেলো বিড়ালটা কোলে নিয়ে বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল। বিড়ালটা মনিবের গায়ে উষ্ণতায় চক্ষু বুজল।

[গ্রীক রুপকথার আলোকে রচিত]

শেয়ার করুন...




© All rights reserved
Design & Developed BY ThemesBazar.Com